মহাকবি কালিদাস
মহাকবি কালিদাসের কাব্য প্রতিভা:
সংস্কৃত সাহিত্যমালঞ্চের সুনিপুণ মালাকার হলেন কালিদাস। তাঁর রচনাকৌশলে নানা বর্ণ, নানা গন্ধ বিলসিত কুসুমশয্যায় সংস্কৃত সাহিত্যকানন সুসজ্জিত। দেশ ও কালের সীমা অতিক্রম করে তার কবিকৃতি বিশ্বসাহিত্যের দরবারে শাশ্বত প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছে। যেরূপ ইংরেজি সাহিত্যের সঙ্গে শেকসপিয়রের নাম জড়িত, বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ, সংস্কৃত সাহিত্যের সঙ্গে কালিদাসের নাম সেইরূপ চিরপ্রোথিত।
কালিদাসের মহাকাব্য
কুমারসম্ভবম্ ~
সংস্কৃত সাহিত্য জগতে মহাকবি কালিদাস দুটি মহাকাব্য উপহার দেন। তার মধ্যে কুমারসম্ভবম তার তরুণ বয়সের রচনা। এই মহাকাব্যটি সতেরোটি সর্গে বিভক্ত। তবে এর প্রথম আটটি সর্গ কালিদাসের রচনা। বাকি নয়টি সর্গের রচয়িতা তিনি নন। এই কারণেই মল্লিনাথ ও অরুণগিরি কালিদাসের রচিত প্রথম আটটি সর্গের টীকা রচনা করেছেন।
কাব্য বৈশিষ্ট্য ~
ক) কালিদাস কুমারসম্ভবম্ কাব্যে বিদেহী প্রেমের স্বরূপকে তাঁর কাব্যে রূপ দিয়েছেন।
খ) রবীন্দ্রনাথ কুমারসম্ভবের প্রশংসা করে বলেছেন - কুমারসম্ভবম্ কাব্যে গল্প নেই – যেটুকু আছে তা সূক্ষ্ম, প্রচ্ছন্ন এবং অসমাপ্ত। কিন্তু কবির বক্তব্য সুদৃঢ় ও সংযত। তাঁর মতে – নরনারীর প্রেম সুন্দর নয়, যদি তা আপনার মধ্যে সংকীর্ণ হয়ে থাকে, কল্যাণকে জন্মদান না-করে।
গ) আনন্দবর্ধন অষ্টম সর্গে বর্ণিত কামক্রীড়ায় কালিদাসের প্রতিভা শক্তির পরিচয় পেয়েছেন।
ঘ) “উপমা কালিদাসস্য” এই প্রশংসাবাক্য কুমারসম্ভবে যত্রতত্র দেখা। যেমন “প্রভা মহত্যা শিখয়েব দীপঃ” অথবা যৌবনোদ্ভিন্ন দেহ – “সূর্যাংশভিন্নমিবারবিন্দম্।”
ঙ) এই নিসর্গ বর্ণনা অনুপম, যেমন – অষ্টম সর্গের প্রকৃতি বর্ণনা।
চ) কালিদাসের বর্ণনা এখানে অলংকৃত ও কাব্যগুণ সমৃদ্ধ।
ছ) জাহ্নবীকুমার চক্রবর্তী বলেছেন – কুমারসম্ভব সুউচ্চ কল্পনা বহুশ্রুতত্ব এবং মানবস্বভাব পরিজ্ঞানের স্বাক্ষর।
জ) এই কাব্যে শান্ত, শৃঙ্গার, করুণ, বীর প্রভৃতি রসের প্রবাহ স্বতন্ত্রভাবে অবিরোধে প্রবাহিত হয়েছে।
ঝ) উক্তি বৈচিত্র্যে কুমারসম্ভবের প্রায় প্রতিটি শ্লোক যেন এক-একটি নিটোল মুক্তো।
ঞ) কালিদাসের প্রকৃতি চেতনা অসাধারণ, যেমন - তৃতীয় সর্গে ‘অকাল-বসন্ত' বর্ণনায়, চতুর্থ সর্গে ‘রতিবিলাপে’, পঞ্চম সর্গে পার্বতীর তপশ্চর্যা প্রথম সর্গে ‘পার্বতীর রূপ’ বর্ণনায়।
ট) এই কাব্যে পাওয়া যায় সমকালীন গার্হস্থ্য জীবনের এক অপূর্ব চিত্র।
ঠ) পৌরাণিক বিশ্বাস ও সংস্কারকে ক্ষুণ্ণ না-করেও কবি তার কাব্যে এক আশ্চর্য স্বপ্নময়া বিস্তার করেছেন।
ড) এই কাব্যে কবির কাব্যপ্রতিভা ও নাট্যদক্ষতার চমৎকার সহাবস্থান ঘটেছে।
একদিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সুনিপুণ বর্ণনা, অন্যদিকে মানব স্বভাবের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ – কালিদাস উভয় ক্ষেত্রেই যথেষ্ট মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। এযুগে জন্ম নিলে তিনি হয়তো কবি না-হয়ে ঔপন্যাসিক হতেন।
রঘুবংশম্ ~
উনিশ সর্গে বিভক্ত রঘুবংশম্ মহাকাব্য কালিদাসের পরিণত বয়সের সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ। দণ্ডী প্রদত্ত মহাকাব্যের সংজ্ঞা অনুযায়ী কালিদাসের রঘুবংশম্ শ্রেষ্ঠ মহাকাব্যেরই পর্যায়ভুক্ত।
কাব্য বৈশিষ্ট্য ~
ক) রঘুবংশম্ কালিদাসের পরিণত প্রতিভার সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্য। এই কাব্যে কালিদাসের কবিকল্পনার পূর্ণ বিকাশ ঘটেছে।
খ) বিদ্যাসাগরের মতে – সংস্কৃত ভাষায় যত মহাকাব্য আছে তার মধ্যে কালিদাস প্রণীত রঘুবংশম্ সর্বাপেক্ষা ও সর্বাংশে উৎকৃষ্ট মহাকাব্য।
গ) ভাবগাম্ভীর্যে এ কাব্যের ভাষা অতুলনীয়।
ঘ) বিভিন্ন সামাজিক রীতিনীতি বর্ণনা ও প্রাকৃত সৌন্দর্যের বর্ণনা অনুপম।
ঙ) কালিদাসের প্রকৃতি বর্ণনার কৃতিত্ব অসাধারণ। সমুদ্র, পর্বত, অরণ্যের শোভা বর্ণনায় রঘুবংশের ত্রয়োদশ সর্গটি আশ্চর্য সুন্দর কতকগুলি উপমার জন্য স্মরণীয়। যেমন –
“দূরাদয়শ্চক্রনিভস্য তন্বী তমালতালীবনরাজিনীলা।
আভাতি বেলা লবণাম্বুরাশের্ধারা নিবন্ধেব কলঙ্করেখা।।” (১৩/১৫)
বসন্তকাল, গঙ্গাযমুনাসংগম, বশিষ্ঠের তপোবন প্রভৃতি নৈসর্গিক পরিবেশ বর্ণনায় কালিদাসের ভুবনমোহিনী প্রতিভার স্বাক্ষর এখানেও বিদ্যমান।
চ) শব্দ ও অর্থের এমন সংযোগ খুব কম কাব্যেই লক্ষ করা যায়।
ছ) আলংকারিকগণ এই কাব্য থেকে যথেষ্ট উদ্ধৃতি সংগ্রহ করেছেন।
জ) রঘুবংশম্ যেন এক বিরাট চিত্রশালা।
ঝ) চতুর্দশ সর্গের সীতা পরিত্যাগ অংশটি করুণ রসের বিহ্বলতায় সকলকে আবিষ্ট করে। ঞ) ভোগ নয়, ত্যাগই হল কল্যাণ, সৌন্দর্য ও মাধুর্যের উৎস – কালিদাসের এই জীবনদর্শনও এখানে প্রকাশ পেয়েছে।
বর্ণনা বৈচিত্র্যে, ছন্দমাধুর্যে, শব্দার্থে, ধ্বনিমাধুর্যে, উপমা নৈপুণ্যে, স্বচ্ছ রসসমৃদ্ধ বাক্প্রতিমা রচনায়, ভাবসুষমার পরিপাট্যে কালিদাস জগৎ ও জীবনের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে এক অনন্যসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন এই রঘুবংশম্ মহাকাব্যে।
কালিদাসের খণ্ডকাব্য বা গীতিকাব্য
মেঘদূতম্ ~
মেঘদূতম্ মহাকবি কালিদাসের অপরা সৃষ্টি গীতিকাব্যের অপূর্ব আলেখ্য। কবিচিত্তের সুতীব্র বিরহবেদনা যেন ভাষায় মূর্ত হয়ে উঠেছে এই কাব্যে। মন্দাক্রান্তা ছন্দে লেখা শতাধিক পদ্যে রচিত প্রেমমূলক কাব্যটি পূর্বমেঘ ও উত্তরমেঘ নামে দুটি অংশে বিভক্ত।
কাব্যবিচার ~
মেঘদূতম্ কালিদাসের তথা সংস্কৃত সাহিত্যের একখানি অভিনব কাব্য। আত্মভাবনাময় এমন অপূর্ব গীতিকাব্য সংস্কৃত সাহিত্যে এর আগে ছিল না, আর হবেও না। এই কাব্যে বিরহী যক্ষের আকাঙ্ক্ষাপূর্ণ অনুভূতির স্পর্শ খুব তীব্র। এই কাব্যে কালিদাসের প্রেমচেতনা কেবল সম্ভোগের সঙ্গে যুক্ত নয়, প্রেম সম্পর্কে কবির হৃদয়ে যে একটা পূর্ণতার আদর্শ ছিল, মেঘদূতম্ সেই আদর্শের স্বরূপ। প্রেমোন্মত্ত অভিশপ্ত নায়কের বিরহবেদনা ও পুঞ্জীভূত শোক, মন্দাক্রান্তা ছন্দের বিলম্বিত তালে বিশ্বব্যাপ্ত হয়ে উঠেছে। দেশে-বিদেশে নানা ভাষায় এই কাব্যটি অনূদিত হয়েছে। মহাকবি গ্যেটে অনূদিত কাব্য পাঠ করে মুগ্ধ হয়ে প্রশংসাসূচক একটি কবিতা রচনা করেন।
মেঘদূতম কাব্যের প্রকৃতিচেতনাও প্রশংসার দাবি রাখে। প্রকৃতি এখানে সচেতন স্পর্শকাতর। মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির যে একটা নিবিড় অন্তরঙ্গ যোগ রয়েছে কালিদাস তা সহৃদয় পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। বিরহী যক্ষের বিরহবেদনার তীব্রতা এবং বিরহিণীর সুগভীর আর্তি মহাকবি নিজের অনুভব দিয়ে নিখিল মানব-মানবীর শাশ্বত বিরহরূপে কল্পনার রঙে চিত্রিত করেছেন। এই মৃন্ময়তার স্পর্শে মেঘদূত সার্থক গীতিকাব্য হয়ে উঠেছে। যদি গীতিপ্রবণতা ও আত্মগত ভাবনার দ্বারা বহির্জগৎকে আত্মসাৎ করা গীতিকাব্যের মূল লক্ষ্য হয়, তবে সেদিক দিয়েও ‘মেঘদূত’ প্রকৃত গীতিকাব্যের উৎকৃষ্ট নিদর্শন। বেদনার ব্যাপ্তি, দুঃখের ঐকান্তিক গভীরতা, প্রিয়ামিলনের ব্যাকুলতা, তন্ময়ীভাবের রোমান্টিক আবেগ মেঘদূতকে সর্বকালের সার্থক গীতিকাব্যে পরিণত করেছে।
ঋতুসংহারম্ ~
ঋতুসংহারম্ কালিদাসের প্রথম জীবনের রচনা। এতে গ্রীষ্ম থেকে বসন্ত এই ছয় ঋতুকে ঘিরে কবিকল্পনার সমাহার শ্লোকবন্ধে সাজানো হয়েছে। ছয় ঋতুর জন্য ছয়টি সর্গ নির্দিষ্ট। মোট শ্লোক সংখ্যা – ২৮ + ২৯ + ২৮ + ১৯ + ১৬ + ৩৮ = ১৫৮। এই গ্রন্থে কালিদাসের কাব্য শক্তির পূর্ণবিকাশ ঘটেনি বলেই অনেকে এটিকে কালিদাসের রচনা নয় বলে মনে করেন।
কাব্য বৈশিষ্ট্য ~
ক) ঋতুসংহার মূলত শৃঙ্গার রসের কাব্য।
খ) প্রতিটি ঋতু এক-একটি রতিভাবের উদ্দীপক, কোথাও সম্ভোগের, কোথাও বা বিলম্ভের। যেমন– গ্রীষ্ম – ভয়াল মূর্তি,
বর্ষা – রত্নভূষিতা বারাঙ্গনা,
বর্ষা - বিরহের,
বসন্ত – মিলনের।
গ) এই কাব্যে প্রধানত শ্লেষ, বিরোধাভাস, ভ্রান্তিমান রূপক, উৎপ্রেক্ষা এবং উপমা অলংকারের প্রয়োগ ঘটেছে।
ঘ) উপেন্দ্ৰবজ্রা, উপজাতি, বংশস্থবিল, বসন্ততিলক, মালিনী ও শার্দূলবিক্ৰীড়িত - এই ছয়টি ছন্দের ব্যবহার করেছেন কবি।
ঙ) কিথ-এর মতে – এই কাব্যের ভাষা যথেষ্ট সহজ ও সরল। তাই মালসানের টীকা রচনার প্রয়োজন হয়নি।
চ) ঋতুসংহার-এর প্রকৃতির স্বতন্ত্র চরিত্র নিপুণভাবে বর্ণিত। যেমন – বর্ষায় রাজার মতো মেঘাগম ‘রাজবদুন্নত ধ্বনি’, মেঘ – ‘নীলোৎপলপত্রকান্তি’।
ছ) বঙ্কিমচন্দ্র - উৎকৃষ্ট কৃতির বর্ণনা, মাধুর্য, প্রসাদগুণ ও স্বভাবানুকারিতার জন্য ঋতুসংহারম্কে টমসনের কাব্যের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
