-->

ঘোড়সওয়ার – বিষ্ণু দে

 

ঘোড়সওয়ার – বিষ্ণু দে

ঘোড়সওয়ার

‘চোরাবালি’ কাব্যের অন্যতম কবিতা ‘ঘোড়সওয়ার’। কবিতায় বহু স্তরের ব্যঞ্জনা থাকায় এর রসাবেসন অধিকতর আকর্ষণধর্মী হয়ে উঠেছে। একই কবিতায় বহুতর দৃষ্টিভঙ্গির সন্ধান মেলায় কবিতাটি হয়ে উঠেছে এ অনন্য রচনা। আবু সৈয়দ আইয়ুব বলেছেন –

এটি প্রেমের কবিতা, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত এর মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন প্রকৃতি ও পুরুষ, তথা ভক্ত ভগবানের সম্বন্ধ।

আধুনিক কাব্য-কবিতার বিশিষ্ট সমালোচক দীপ্তি ত্রিপাঠী বলেছেন –

কবিতাটির একমুখী ব্যাখ্যা করলে তার প্রতি অবিচার করা হবে। ব্যক্তির অধীর আবেগ ও সমষ্টির প্রবল শক্তি, প্রেম ও সমাজতত্ত্ব কবিতাটির মধ্যে একাকার হয়ে গেছে। উৎসাহ ও উদ্দীপনা এবং গভীর এমন সমন্বয় বাংলা সাহিত্যে দুর্লভ।

আসলে কবিতাটিতে মূলত: বাঙালী মধ্যবিত্তের বৃহত্তর জনসমষ্টি থেকে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি এবং তা থেকে উদ্ভূত সংকটের চেতনা বাণী রূপ লাভ করেছে। এই সংকটের হাত থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে কবি মার্কস নির্দেশিত শ্রেণী সংগ্রামের পথকেই গ্রহণ করেছেন। কবিতার শুরুতেই উত্থাপন করেছেন –

জনসমুদ্রে নেমেছে জোয়ার

হৃদয়ে আমার চড়া।

চোরাবালি আমি দূর দিগন্তে ডাকি –

কোথায় ঘোড়সওয়ার?

জনতার মাঝে জাগরণের জোয়ার এসেছে। কিন্তু মধ্যবিত্ত বাঙালী সমাজের প্রকৃত স্বরূপ, কবির হৃদয় চড়াভূমির বালুকার রুক্ষতায় ভরা। সেখানে নবতর সৃষ্টির কোন সম্ভাবনা নেই। আবার সেই হৃদয় চড়ার মাঝে রয়েছে অনেক সীমাবদ্ধতা। অনেক ভ্রান্তির ইতিহাস চোরাবালির মতই তা প্রতারণার ফাঁদ পেতে রয়েছে। এ থেকে মুক্তি দিতে পারে যে জননেতা, কবির চোখে সে বলদৃপ্ত ঘোড়সওয়ারের রূপ নিয়ে প্রতিভাত। কবি আকুল আবেদনে তাকে আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন–

কেন ভয়? কেন বীরের ভরসা ভোলো?

এখানে ঘোড়সওয়ারকে জননেতা না ভেবে প্রেমিক পুরুষও ভাবা যায়। প্রেমিকার হৃদয় চড়ার মত নিঃসঙ্গ নিষ্ফলতায় ভরা। সেখানে আবার নানা প্রকাশ আশঙ্কা, হতাশাবোধ বিষাদের চোরাবালিও সৃষ্টি হয়েছে। প্রেমিক ঘোড়সওয়ার যেন প্রেমিকা হৃদয়ের এই শূন্যতাকে দূরে সরিয়ে তার নিষ্ফল হৃদয়কে পরিপূর্ণ করে তোলে। পরবর্তী অংশে এই প্রেম অনুষঙ্গ আরো বেশী স্পষ্ট হয়েছে –

হে প্রিয় আমার, প্রিয়তম মোর!

আয়োজন কাঁপে কামনার ঘোর,

অঙ্গে আমার দেবে না অঙ্গীকার?

আসলে কভির মধ্যে অনুরণিত হয়েছে বিংশ শতকের এক জটিল মানসিকতায় প্রভাব। যুগগত হতাশাবোধ তাঁর চেতনাকেও আলোড়িত করেছে। প্রাত্যহিক জীবনের অন্তঃসারশূন্যতা, সেই সঙ্গে ব্যক্তি মানবের প্রেমের ক্ষেত্রেও অপরিসীম শূন্যতা। এ দু’য়ের সংমিশ্রণে কবি চিত্তের যে বিক্ষোভ তারই জটিল প্রকাশ ঘটেছে কবিতাটিতে। 


          আবার প্রেমের চিত্রকল্পের ক্ষেত্রে আর একটি ভিন্নতর মাত্রাও সংযোজিত হয়েছে। এখানে ঘোড়সওয়ারকে আদিম উর্বরতা বিধায়ক শক্তি হিসেবে কিংবা আদিম প্রজনন পূজার প্রতীক হিসাবেও এক সঙ্গে গ্রহণ করা চলে-

হালকা হাওয়ায় বল্লম উঁচু ধরো।

সাত সমুদ্র চৌদ্দ নদীর পার –

হালকা হওয়ায় হৃদয় দু-হাতে ভরো

হঠকারিতায় ভেঙে দাও ভীরু দ্বার।

ইয়ুং-এর মনস্তাত্ত্বিক ভাবনায় লিবিডোর যে ব্যাপকতর তাৎপর্য উদ্ভাসিত হয়েছিল, তার চকিত প্রকাশও এ কবিতায় দৃষ্ট হয়–

পায়ে পায়ে চলে তোমার শরীর ঘেঁষে

আমার কামনা প্রেতচ্ছায়ার বেশে।

চেয়ে দেখ ঐ পিতৃলোকের দ্বার!

কবিতার কোন কোন অংশে সমষ্টি জীবনের সার্থকতার আশা। প্রেমের অধীর ব্যাকুলতার সঙ্গে রূপকথার অনুষঙ্গও মিশ্রিত হয়েছে –

আমার কামনা ছায়ামূর্তির বেশে

পায়ে পায়ে চলে তোমার শরীর ঘেঁষে

কাঁপে তনুবায়ু কামনায় থরোথরো।

***     ***     ***

হালকা হওয়ায় হৃদয় আমার ধরো,

হে দূর দেশের বিশ্ববিজয়ী দীপ্ত ঘোড়সওয়ার!

এই অংশে কামনাতপ্ত প্রেমের তীব্রতাই প্রাধান্য পেয়েছে। আবার মধ্যবিত্তের নির্জন মানসিকতার কথাকেও উপেক্ষা করে চলে না। মিলন কামনার টানে কিংবা মধ্যবিত্তের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে দ্বিধা সংসারের জড়িমা কাটিয়ে যে দীপ্ত প্রত্যয়ের প্রকাশ ঘটেছে এখানে তারই প্রতীক হিমবাহ। কিন্তু যে মুক্তিদাতা ঘোড়সওয়ারের উদ্দেশ্যে ব্যকুল আহ্বান পাঠিয়েছিলো চোরাবালি স্বরূপ মধ্যবিত্ত সে তো দূর দেশের অধিবাসী।

হে দূর দেশের বিশ্ববিজয়ী দীপ্ত ঘোড়সওয়ার!

কিংবা মুক্তিদাতা প্রেমিকের ছবিও এখানে দূর দেশের সঙ্গে অন্বিত হওয়ায় সুদূরতার মায়ায় যেন একটু মোহময় হয়ে ওঠে। রূপকথার স্বপ্নময় জগতের আবহ যেন এখানে সঞ্চারিত হয়। ঘোড়সওয়ারের চিত্র এসে মিশে যায় বন্দিনী রাজকন্যার দুঃসাহসিক মুক্তি প্রয়াসে উদ্যত পক্ষিরাজ ঘোড়সওয়ার দূর দেশের রাজকুমারের ভাবচ্ছবি। এই ভাবে বিশ শতকের সমস্যা বিজড়িত জীব কবি নিপুণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

          সুধীন্দ্রনাথ কথিত প্রকৃতি পুরুষের সম্বন্ধ জ্ঞাপক কবিতা হিসেবেও ঘোড়সওয়ারকে গ্রহণ করার বিপত্তির কিছু নেই। ঘোড়সওয়ারকে ভগবানের প্রতীক রূপে এবং বক্তাকে ভক্ত রূপে বিবেচনা করলে কবিতাটির অর্থ গ্রহণে কোনো অসুবিধা হবে না। ভগবানকে প্রিয়তম রূপে দেখা এদেশে নতুন কোন রীতি নয়। বৈষ্ণব পদাবলীর উজ্জ্বল ঐতিহ্যের উত্তর পুরুষ আমরা। সে ক্ষেত্রে ভক্ত যদি আকুল আবেদনে ভগবানকে প্রিয়তম সম্ভাষণে আখ্যায়িত করেন তাতে অসুবিধে নেই।

          এইভাবে কবিতাটিতে কবির মানস জটিলতার বিভিন্ন অনুষঙ্গগুলির একাধারে রূপায়িত হয়েছে বলেই কবিতার আঙ্গিকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন বা বিষম উপাদানগুলির সন্নিবেশ ঘটেছে। বস্তু সত্যের বিচারে বাহ্য অসঙ্গতি দেখা দিলেও কাব্য সত্যের সামগ্রিক তাৎপর্যের পরিপ্রেক্ষিতে এই আপাত অসঙ্গতি বৃহত্তর সঙ্গতি সূত্রে মিশে যায়। চড়া, চোরাবালি, মৃগতৃষিকা, পাহার গ্লেসিআর, মেরুচূড়া – সমস্ত কিছুকে কবি একই কবিতার আধারে উপস্থিত করেছেন। বাস্তবে এদের একত্র মেলা ভার কিন্তু বাঙালী মধ্যবিত্ত জীবনের বিচ্ছিন্নতা, প্রেমের নিষ্ফলতা ইত্যাদি থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে এই বিষয় বস্তুগুলি সম্ভাব্য সঙ্গতির তাৎপর্যে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। এদিক থেকে কবিতাটির তাৎপর্য অধিক।