-->

চর্যাপদের সাধনতত্ত্ব

চর্যাপদের সাধনতত্ত্ব

চর্যাপদের সাধনতত্ত্ব তথা বৌদ্ধতান্ত্রিক সহজিয়া ধর্ম দর্শন:

বৌদ্ধতান্ত্রিক সহজিয়া ধর্ম দর্শনের ব্যাখ্যায় কয়েকটি পারিভাষিক শব্দ বারংবার আবৃত্ত হয়েছে। অধ্যাত্মবোধের স্বরূপ প্রকাশের জন্য শব্দগুলি অত্যন্ত মূল্যবান। যেমন শূন্যতা, মহাসুখ, চক্রকায়, সহজানন্দ প্রভৃতি। শব্দগুলি সুগভীর ব্যঞ্জনাঋদ্ধ ও সমার্থদ্যোতক। অর্থাৎ যাই শূন্যতা তাই মহাসুখ, তাই চক্রকায় অথবা সহজানন্দ।

সহজিয়া সম্প্রদায়ের কবিবৃদ্ধের দার্শনিক অনুভবে শূন্যতাতত্ত্ব, চক্র বা কায়তত্ত্ব এবং সহজতত্ত্ব বা আনন্দতত্ত্বের প্রত্যেকটির চারটি স্তর কল্পনা করা হয়েছে। যেমন শূন্যতাতত্ত্ব চারটি স্তর যথাক্রমে শূন্য (চিত্তের প্রস্তুতিপর্ব বা সাধনার প্রথম স্তর) > অতিশূন্য (সাধনার মহাস্তর বা দ্বিতীয় স্তর) > মহাশূন্য (সাধনার তৃতীয় স্তর) > সর্বশূন্য (সাধনার চতুর্থ বা সর্বশেষ স্তরনির্বাণ বা মুক্তি)। চক্র বা কায়তত্ত্বেরও চারটি স্তর যথাক্রমে নির্মাণচক্র / নির্মাণকায় (চিত্তের প্রস্তুতিপর্ব বা সাধনার প্রথম স্তর = বোধিচিত্ত) > সাম্ভোগচক্র / সম্ভগকায় (সাধনার দ্বিতীয় স্তর বা মধ্যস্তর) > ধর্মচক্র/ধর্মকায় (সাধনার তৃতীয় স্তর) > মহাসুখচক্র / মহাসুখকায় > সহজচক্র /সহজকায় (সাধনার চতুর্থ স্তর বা সর্বশেষ স্তর)। অনুরূপভাবে আনন্দের বা সহজানন্দের উপলব্ধিরও চারটি স্তর যথাক্রমে আনন্দ > পরমানন্দ > বিরমানন্দ > সহজানন্দ বা নির্বাণের স্তর। সাধনমার্গের প্রতিটি ধারায় সর্বশেষ স্তরটি ছাড়া চিত্তশোধনের তৃতীয় স্তর পর্যন্ত কোনো-না-কোনোভাবে ভবদোষ বা প্রকৃতিদোষ অনুলিপ্ত থাকেই। সাধনার সর্বশেষ স্তরেই প্রতিফলিত হয় সর্বদোষবিনির্মুক্ত নির্মল সহজানন্দের জ্যোতির্ময় অনুভব। একেই বলে মহাসুখ বা সহজসুখ। এই সহজসুখের অনুভবই সহজপন্থীদের কাছে পরমার্থ। এই সুখ বা আনন্দের অনুভব—পরম অনুভত্ব যাঁদের হয়েছে তাঁরাই অর্জন করেছেন জীবন্মুক্তি তথা পরমনির্বাণের অধিকার। তাঁরাই বুদ্ধ—পরমজ্ঞানে অধিষ্ঠিত জরা-ব্যাধি-উত্তীর্ণ মৃত্যুহীন প্রাণ ।

 

চর্যাপদের সাধনতত্ত্ব

৪ সংখ্যাক্রম সাধনার স্তর-নির্দেশক। মানবশরীরের চারটি বিশিষ্ট প্রদেশে তাদের অবস্থান। প্রথম স্তরের অবস্থান নাভিকমল, দ্বিতীয়ের-হৃদয়, তৃতীয়ের-কণ্ঠ ও চতুর্থ বা শেষ স্তরের অবস্থান মস্তক। এক্ষেত্রে হিন্দুধর্ম-দর্শনে বিধৃত পাতঞ্জল যোগপন্থানুসারী ষট্‌চক্রভেদের প্রসঙ্গ আবার স্মরণ করতে হবে। সেখানে তন্ত্রানুসারী ষটচক্রের কল্পনা করা হয়েছে। এই ষট্‌চক্র মূলত শরীরে সুষুম্নানাড়ীমধ্যস্থ পদ্মাকৃতি ষটসংখ্যক চক্র (six mystical circles of the body)। 

তন্ত্রনির্দিষ্ট ষট্‌চক্রের কল্পনাকে সংক্ষিপ্ত করে মাত্র চারটি চক্রভেদের দ্বারা সহজ চক্র বা সহজানন্দের অনুভবে উত্তীর্ণ হবার সাধনা করেছিলেন মহাযানপন্থী সহজিয়া সিদ্ধাচার্যগণ। তাঁদের কল্পনানুভবে ষট্‌চক্রের স্থলে চার চক্রের ও ত্রি নাড়ী (ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না) কল্পনার পরিভাষা অবশ্য পালটে গেছে। সহজিয়া তান্ত্রিক বৌদ্ধ ভাবনায় মূলাধার থেকে সহস্রার পর্যন্ত সাধকচিত্তের গমনাগমনে ত্রিনাড়ীর বিশিষ্ট ভূমিকা আছে এবং সেই তিনটি নাড়ী যথাক্রমে বামগা, দক্ষিণগা ও মধ্যগা বা অবধূতিকা। বামগা নাড়ীকে প্রজ্ঞাএবং দক্ষিণগা নাড়ীকে ‘উপায়রূপে চিহ্নিত করা হয়েছে। সম্ভবত নিম্নাভিমুখী এই দুই দেহমধ্যস্থ নাড়ীকে ঊর্ধ্বমুখী করার জন্য দুই নাড়ীর মধ্যবর্তিনী তৃতীয় নাড়ী মধ্যগা বা অবধূতিকার সহায়তা প্রয়োজন। স্বভাবতই ঊর্ধ্বাভিমুখী অবধূতিকা নৈরাত্মা প্রকৃতি ইন্দ্রিয়াতীত ঊর্ধ্বায়িত রসলোকে পুরুষ ও প্রকৃতির মিলনোদ্ভূত সামরস্যের অনুভূতি অর্জনে বা সহজানন্দ লাভে অনুকূলতা করে। শূন্যতা, চক্র, কায় অথবা আনন্দের সর্বশেষ স্তরে পৌঁছাবার জন্য মধ্যবর্তিনী, ঊর্ধ্বগতি এই অবধূতিকা নাড়ীর ভূমিকা চর্যার সহজ সাধনতত্ত্ব উপলব্ধির জন্য অপরিহার্য। মহানুরাগনয়চর্যার অনুসরণের দ্বারা ঊর্ধ্বরেতা-ইন্দ্রিয়জয়ী সিদ্ধাচার্যের মর্যাদাসহজানন্দ সিদ্ধি এর দ্বারাই সম্ভব। মূল কথাসংসারদোষক্লিষ্ট চিত্তকে গভীর অভিনিবেশ ও আত্মমগ্নতা দ্বারা নির্বাণপথে চালনা ও সহজানন্দস্থিতিএই হল তান্ত্রিক সহজিয়া বৌদ্ধসাধনতত্ত্বের লক্ষ্য।