বাগবাজার এ্যামেচার থিয়েটার ইতিহাস
বাগবাজার এ্যামেচার থিয়েটার
অস্থায়ী নাট্যশালাগুলির সঙ্গে পরবর্তী কালের সাধারণ রঙ্গালয়ের প্রত্যক্ষ কোন যোগ নেই। চারদিকে শখের নাট্যশালায় অভিনয় হচ্ছে দেখে বাগবাজারের কয়েকটি যুবার মনে নাট্যাভিনয়ের ঔৎসুক্য জন্মায়। এরা কয়েকজন মিলে একটি নাট্যদল গড়ে নাম দিলেন ‘Bagbajar Amateur Theatre’। পরবর্তী কালে এরই নাম হয়েছিল শ্যামবাজার নাট্যশালা। এই দলের দুজন অর্ধেন্দুশেখর ও ধর্মদাস সুর জোড়াসাঁকোর কয়লাঘাটায় যুবক প্রহসনের অভিনেতা ও মঞ্চ অধ্যক্ষ রূপে অবতীর্ণ হন। এই অভিনয় এত সফল হয়েছিল যে নাট্যকার রূপে মধুসূদনের আবির্ভাবের পূর্বে যত অভিনয় হয়েছিল এটিকেই সর্বোৎকৃষ্ট বলে অনেকে মনে করেন। অর্ধেন্দুশেখরের অভিনয়ই যে এর মূল কারণ ছিল তা অনুমান করা কঠিন নয়। বাগবাজার এ্যামেচার থিয়েটার যখন ‘সধবার একাদশী’ রিহার্সাল দিতে শুরু করে তখন দলের প্রধান অভিনেতারা ছিলেন নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, গিরিজা ঘোষ ও রাধামাধব রায় কর। নগেন্দ্রনাথ সকলকে জানান একজন নতুন অভিনেতা খুব ভাল অভিনয় করেছেন— যাঁর নাম অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি। এদের ডাকে অর্ধেন্দুশেখরও বাগবাজার এ্যামেচার থিয়েটারের দলভুক্ত হন। অর্ধেন্দুশেখর, গিরিশ ঘোষের পূর্ব পরিচিত ছিলেন। অভিনয় ক্ষমতাও ছিল প্রচুর। অনেকে মনে করেন অমৃতলালের নাট্যগুরু গিরিশচন্দ্র। কিন্তু তা নয়। প্রকৃতপক্ষে অমৃতলালের বাল্যবন্ধু অর্ধেন্দুশেখরই ছিলেন তাঁর গুরু। অর্ধেন্দুর অনুরোধেই অমৃতলাল ডাক্তারি শিক্ষা বিসর্জন দিয়ে অভিনয় জীবনে আসেন। পরবর্তী কালে অর্ধেন্দুর মৃত্যুর পর অমৃতলাল এই নাট্যগুরুকে অর্পণ করেছিলেন—
রঙ্গের সুধার সিন্ধু রঙ্গাকাশপূর্ণ ইন্দু
অর্ধেন্দুশেখর সখা বঙ্গে নটরায়।
মোর হাতে খড়ি গোড়ায় দিয়েছ গড়ি
তাই আজ নট নামে মোর পরিচয় ।৷
এই নাট্যগোষ্ঠী ১৮৫৮ সালে সপ্তমী পূজার দিন বাগবাজারে ‘সধবার একাদশী’ অভিনয় করেন। এই অভিনয় অত্যুৎকৃষ্ট হয়েছিল। বিশেষত নিমচাঁদের ভূমিকায় গিরিশ ঘোষের অভিনয় অদ্বিতীয়। পরবর্তী কালে ১৮৭০ এই নাটকেরই অভিনয় দেখে সারদাচরণ মিত্র লিখেছিলেন—“নিমচাঁদের অভিনয় দেখিয়া আমি আনন্দে আপ্লুত হইলাম।” অভিনয় জীবন বরণ করার আগে অমৃতলালও গিরিশচন্দ্রের নিমচাঁদ দেখেছিলেন। গিরিশচন্দ্রের মৃত্যুর পর লেখা নিমচাঁদের স্মৃতি প্রকাশ পেয়েছিল——
মদে মত্ত পাতালে নিমে দত্ত রঙ্গস্থলে
প্রথম দেখিল বঙ্গ নব নটগুরু তরে।
আবার এই নাটকে অর্ধেন্দুশেখর জীবনচন্দ্রের ভূমিকা দেখে নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র স্বয়ং অর্ধেন্দুকে বলেছিলেন— “আপনি অটলকে লাথি মেরে চলে গেলেন। এটি Improvement of the author. আপনি এবার ‘সধবার একাদশী’র নতুন সংস্করণে অটলকে লাথি মারিয়া গমন লিখে দেব।” বাগবাজার এ্যামেচার থিয়েটারে সাতবার ‘সধবার একাদশী’ হয়েছিল। শেষবার হয় জোড়াবাগানে লক্ষ্মীনারায়ণের বাড়ি ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে দুর্গাপূজার সময়। এই সময় দীনবন্ধুর ‘বিয়ে পাগলা বুড়ো’ অভিনীত হয়। এরপর বাগবাজারে এ্যামেচার থিয়েটার কিছুকাল বন্ধ ছিল। যদিও এই সময় তারা ‘লীলাবতী’ রিহার্সাল দিচ্ছিলেন। এই সময় অমৃতলাল ডাক্তারি শিক্ষার জন্য কাশী থেকে কলকাতা এসেছিলেন এবং রিহার্সাল দিয়েছিলেন। চুঁচুড়ার বঙ্কিমচন্দ্র ও অক্ষয় সরকারের তত্ত্বাবধানে ‘লীলাবতী’ অভিনীত হয়। অমৃতলাল প্রভৃতি ব্যক্তিরা নিমন্ত্রিত হয়ে অভিনয় দেখে এলেন। এতে মুগ্ধ হয়ে অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি তাকে জোর করে টেনে আনলেন। এবার সম্প্রদায়ের নাম রাখা হল ‘শ্যামবাজার নাট্য সমাজ’। ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দের ৮ মে রাজেন্দ্রলাল রায়ের বাড়িতে মঞ্চ বেঁধে তাঁরা ‘লীলাবতী’ নাটকের অভিনয় করলেন। রিহার্সাল দিয়েও অমৃতলাল স্টেজে দাঁড়াতে পারলেন না, তাঁকে কাশীতে চলে যেতে হল। অভিনয়ের পূর্বে কালবৈশাখীর দাপটে একটু বিশৃঙ্খল হয়েছিল কিন্তু তৎসত্ত্বেও খুব ভাল হয়। অর্ধেন্দুশেখর এতে হরিবিলাস, গিরিশ; রাধামাধব কর, ক্ষীরোদবাসিনীর ভূমিকায় অভিনয় করে খুব প্রশংসা লাভ করেছিলেন। তার অঙ্গভঙ্গি, বাকপটুতা ও স্বরমাধুর্য সবাইকে মুগ্ধ করেছিল। রঙ্গভূমিটিও প্রস্তুত ছিল। মোট ৮টি দৃশ্য ছিল। তার মধ্যে কয়েকটি খুব সুন্দর ভাবে চিত্রিত হয়েছিল। এই দৃশ্যগুলি আঁকবার ভার ছিল ধর্মদাসের উপর। দীনবন্ধু চুঁচুড়া এবং বাগবাজারের দুটি অভিনয়ই দেখেছিলেন, তাঁর মতে বাগবাজারের দলের অভিনয়ই উৎকৃষ্ট হয়েছিল। এই দল তিনবার এই নাটক অভিনয় করে।

