ক্লাসিক কবি জন মিলটন ও তাঁর মহাকাব্য
জন মিলটন ও তাঁর মহাকাব্য
জন মিলটন সপ্তদশ শতাব্দীর কবি। আধুনিক সাহিত্য ষোড়শ শতাব্দী থেকে স্পষ্ট হতে আরম্ভ করেছিল; সপ্তদশ শতাব্দীতে ইংরেজ সাহিত্যের আধুনিকতা অনেক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে মিলটনের হাতে। আবার এই সঙ্গেই বলা যায় যে ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসের চিরকালের ক্লাসিক কবি তিনি।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথের মতো কবি থাকা সত্ত্বেও মধুসূদনই একমাত্র ‘মহাকবি’ তেমনি ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে শেক্সপীয়ারের উপস্থিতি সত্ত্বেও মিলটনই একমাত্র মহাকবি। তাঁর ‘প্যারাডাইস লস্ট’ (১৬৬৭) এবং এর দ্বিতীয় পর্ব ‘প্যারাডাইস রিগেনড’ (১৬৭৬) অন্যতম শ্রেষ্ঠ শৈল্পিক মহাকাব্য। এই কাব্য এবং এইকাব্যে ব্যবহৃত ‘Blank Verse’ ছন্দের জন্য মিলটনের কাব্যে ঋণী হয়ে আছেন একজন বাঙালি কবি তিনি মধুসূদন দত্ত। মিলটন সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেছিলেন—“Milton is divine.”
মিলটন কেবল মহাকাব্যের কবি রূপে নন, তার সমকালীন রাজনীতি, সমাজনীতি, ধর্মনীতি ইত্যাদি প্রায় সর্বক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ছিলেন। কবিতার পাশাপাশি গীতিকাব্যও লিখেছেন আবার শিক্ষা, নারীজাগরণ, বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদ, সংস্কার ইত্যাদি দিয়ে বেশ কিছু প্রবন্ধ ও পুস্তিকা রচনা করেছেন মিলটন। কবিতার ক্ষেত্রে তিনি ওড, এলিজি, সনেট, এপিক ইত্যাদি নানাজাতের কবিতা লিখেছেন।
জন মিলটনের কয়েকটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা—
অন দি মর্নিং অব ক্রাইসটস্ নেটিভিটি (On the Morning of Christ's Nativity):
১৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের আগে লেখা হয়ে হয়েছে এই কবিতা। এটি মিলটনের প্রথম কবিতা। এর বিষয়বস্তু হল বেথেলহেমের ঘোড়ার আস্তাবলে যীশুর জন্ম এবং আকাশের তারা দেখে তিন প্রাচ্য বৃদ্ধির সেই দিকে যাত্রার কাহিনী বিবৃত হয়েছে।
লালেগরো (L'Allegro) ও ইল পেনসেরোসো (It Penseroso):
এই দুটি দীর্ঘ কবিতা লেখেন ১৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে। দুটি কবির প্রথম যুগের রোমান্টিক কাব্য।
কোমাস (Comus):
১৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দে কোমাস নামে যে নাটকটি লিখেছিলেন সেটি রূপকধর্মী নাটক। ইংরেজিতে এগুলিকে প্যাস্টোরল ভার্স বা রাখালিয়া কবিতা বলে। ইংল্যান্ডের জনৈক রাজপুরুষ আর্ল অব ব্রিজওয়াটার এসেছিলেন লাড়লো নাম দুর্গ উদ্বোধন করতে সেই উপলক্ষে এই নাট্যকাব্যটি লেখেন। এখানেই থেকেই প্রথম বাংলাতে মধুসূদন ‘Blank Verse’ ব্যবহার করেন।
লিসি ডাস (১৬৩৮):
‘Lycidas' এটি একটি শোকগাথা। কবি কেমব্রিজের সহপাঠী এডওয়ার্ড কিং-এর অকাল মৃত্যুতে লিখেন।
স্যামসন অ্যাগোনিস্টেস (Samson Agonistes):
১৬৭১ খ্রী:-এ লেখা মিলটনের একটি নাটক। গ্রীক নাটকের আদর্শে এটি লেখা এটি মিলটনের একমাত্র কমেডি নাটক।
প্যারাডাইস লস্ট (Paradise Lost):
মিলটনের সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা ‘প্যারাডাইস লস্ট’(Paradise Lost)। ১৬৫৮ খ্রী: এই মহাকাব্য লিখতে আরম্ভ করেন তিনি। ১৬৬৭ খ্রিষ্টাব্দে এটি শেষ হয়। দশ খণ্ডে লেখা হয়েছিল মহাকাব্যটি। ১৬৭৪ খ্রিষ্টাব্দে যখন পুনঃপ্রকাশিত হয় তখন এতে ছিল বারটি খণ্ড। ‘প্যারাডাইস লস্ট’ (Paradise Lost) এক কাল্পনিক মহাকাব্য। বাইবেল থেকে এক কাহিনি চয়ন করেছিলেন মিলটন। তাতে দেখানো হয়েছে ঈশ্বরের প্রতি বিদ্বেষের কারণে শয়তানকে স্বর্গ থেকে বিচ্যুত করা হয়েছিল। তাই সে প্রতিশোধ নিতে চায়। ঈশ্বরের সৃষ্টি শৃঙ্খলা ভেঙে দিতে চায়। একদিন সে স্বর্গের বাগানে নিষ্পাপ আদম আর ইভকে প্রলুব্ধ করে তাদের নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খাওয়ায়। তাদের মনে কামনা সৃষ্টি হয় এবং তারা স্বর্গ বিচ্যুত হয়। এরপর মানবপুত্র যীশু তাদের পাপ গ্রহণ করে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তখন ঈশ্বর আদম আর ইভকে পুনরায় ভিন্ন স্বর্গে স্থাপন করেন।
প্যারাডাইস লস্ট (Paradise Lost) মিলটনের তথা ইংরেজি সাহিত্যের একমাত্র মহাকাব্য। এর ধ্বনি, ছন্দ, ভাষা, ত্রিলোক-অতীতলোক কাহিনি, দেব-দানব ও মানবের মধ্যে সম্পর্ক সমস্তই আঁকা হয়েছে এক বৃহৎ ও মহৎ আদর্শের প্রেক্ষাপটে। মহাকাব্যিক গাম্ভীর্য রক্ষিত হয়েছে সমস্ত কাব্যে সেই সঙ্গে খ্রিষ্টীয় ধর্মবোধ চালনা করেছে কবিকে।
প্যারাডাইস রিগেইন্ড(Paradise Regained):
১৬৭৬ খ্রিষ্টাব্দে প্যারাডাইস রিগেইন্ড (Paradise Regained) নামে চারখণ্ডে যে কাব্য মিলটন লেখেন তা ‘প্যারাডাইস লস্ট’-এর পরিপূরক অংশ। কিন্তু ‘প্যারাডাইস লস্ট’-এর মতো খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা পাইনি ‘প্যারাডাইস রিগেইন্ড’ (Paradise Regained)।
শেষ জীবনে দৃষ্টিহীন হয়েছিলেন মিলটন। ১৬৫৮ খ্রিষ্টাব্দে স্ত্রীকেও হারিয়ে ছিলেন। এইসব যন্ত্রণা তাকে স্থিত করেছে ঈশ্বর নিষ্ঠায়। বেশ কয়েকটি সনেটে নিজের মনের কথা ব্যক্ত করেছেন মিলটন। তাদের মধ্যে ‘On his Blindness’ বিখ্যাত। মিলটন ইংরেজি সাহিত্যের চিরকালের ক্লাসিক কবি।
