ইংরাজি সাহিত্যে ঐতিহাসিক ঔপন্যাসিক স্যার ওয়াল্টার স্কট
ঐতিহাসিক ঔপন্যাসিক স্যার ওয়াল্টার স্কট
ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে যাকে রোমান্টিক যুগ বলা হয় ঔপন্যাসিক ওয়াল্টার স্কট ছিলেন সেই যুগের মানুষ। ১৭৭১ খ্রিষ্টাব্দে জন্ম এবং ১৮৩২ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যু। স্কট ইংরেজি ঐতিহাসিক উপন্যাসের জনক রূপে সর্বজন স্বীকৃত। স্কট তাঁর কল্পনা ও শিল্পবোধের সমগ্রতায় দূরবর্তী এবং নাতিদূর অতীতের যে প্রাণবন্ত ও বিশ্বযোগ্য পুনর্নির্মাণ পাঠকদের উপহার দিলেন তা ছিল এক কথায় অভূতপূর্ব। অতীতের মনোহর স্বপ্ন, ঐতিহাসিক দুর্গে ও প্রাসাদে শৌর্য-ঐশ্বর্যের স্মৃতি, ঘটনার ঘনঘটা তথা চরিত্রের চলমানতা নিয়ে এক পুনর্জীবিত ঐতিহাসিক চলচ্ছবি স্কটের পূর্ববর্তী কোনো রচনায় পাওয়া যায়নি।
দ্বাদশ শতাব্দী থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত অর্থাৎ গ্রেট ব্রিটেনের প্রাচীন ইতিহাসের কাহিনী সংগ্রহ করে তার উপন্যাসের পটভূমিতে সেগুলি ব্যবহার করেছেন স্কট। এই সঙ্গে আর একটি বিষয় লক্ষণীয়—সেটি হল রোমান্স বা রূপকথা বা কিংবদন্তী মূলক কাহিনীকে শিল্প রূপ দেওয়া। তার মধ্যে থাকে রহস্যময়তা। সব মিলিয়ে স্কট ইংরেজি উপন্যাসে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল।
স্যার ওয়াল্টার স্কটের ঐতিহাসিক উপন্যাসের মধ্যে প্রধান প্রধান রচনাগুলি হল—
১. ওয়েভারলি (Wiverley) ১৮১৪ (প্রথম উপন্যাস)
২. গাই ম্যানারিং (Guy Mannering) ১৮১৫
৩. দি অ্যান্টিকুইরি (The Antiquary) ১৮১৬
৪. দি ওল্ড সোরটালিটি সপ (The old Mortality Shop) ১৮১৭
৫. দি হার্ট অফ মিডলোসিয়ান (The Heart of Midlothian) ১৮১৮
৬. দি ব্রাইড অফ ল্যামারম্যুর (The Bride of Lammermoor) ১৮১৯
৭. আইভানহো (Ivanhoe) ১৮১৯
৮. দি মনাস্টারি (The Monastery) ১৮২০
৯. কেনিলওয়ার্থ (Kenilworth) ১৮২১
১০. দি পাইরেট (The Pirate) ১৮২২
১১. দ্য ফরচুনস অব নাইজেল (The Fortunes of Nigel) ১৮২২
১২. কোয়ান্টিন ডারওয়ার্ড (Quentin Durward)১৮২৩
১৩. দি ট্যালিসম্যান (The Talisman) ১৮২৫
সুতরাং দেখা যাচ্ছে স্কটের লেখা উপন্যাসের খুব কম নয়। এই বিস্তৃত রচনাবলীর মধ্যে সমালোচকদের ‘আইনভানহো’কেই সর্বশ্রেষ্ঠ বলা হয়। তবে ‘দি ব্রাইড অফ ল্যামারম্যুর’ উপন্যাসটিও বিশ্ব বিখ্যাত হয়েছে। অধিকাংশ উপন্যাসেই স্কট লুপ্ত ইতিহাসের রহস্য পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন। তার সম্পর্কে একজন সমালোচক লিখেছেন—“His affords are a legend of literary heroism.”
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বঙ্কিমচন্দ্র যেমন সফল উপন্যাস রচয়িতা ঠিক তেমনি ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে স্কট প্রথম ঐতিহাসিক উপন্যাস রচয়িতা। এই সব উপন্যাস আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়েছে মধ্যযুগীয় অতিকথা ও রোমান্সের সমন্বয়ে। ‘দি ব্রাইড অফ ল্যামারমুর’-এর কাহিনীটি হল এক হিংসা ও প্রতিশোধের করুণ কাহিনী। নায়ক র্যাভেন্স উড আর নায়িকার নাম লুসি। তারা পরস্পরের প্রতি তীব্র প্রেমে আসক্ত থাকলেও পারিবারিক দিক থেকে ছিল তাদের বিরোধ। বংশানুক্রমিক ভাবে দুটি পরিবার পরস্পরকে শত্রু বলে জানত। তাই লুসির মা লুসিকে ভুল বুঝিয়ে অন্য পুরুষের সঙ্গে তাকে বিয়ে দেয়। এই ঘটনায় র্যাভেন্স উড ক্রুদ্ধ হয় এবং প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে লুসিও এই মানসিক বিপর্যয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং নিজের স্বামীকে খুন করে। র্যাভেন্স উড তা জানত না সে তার চরম শত্রু লুসির ভাই ও তার স্বামীর সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে যায় প্রান্তরের মধ্য দিয়ে। কিন্তু অকস্মাৎ মারাত্মক এক দুর্ঘটনা ঘটে। চরাবালিতে আটকে যার র্যাভেন্স উডের ঘোড়া। ধীরে ধীরে চোরাবালি গ্রাস করে নেই র্যাভেন্স উডকে। এই ভাবের এক প্রেমিক পুরুষের মর্মান্তিক পরিণতি আমরা দেখতে পায়।
মধ্যযুগের ইংল্যান্ডের ইতিহাস থেকে কাহিনী নিয়ে ‘আইনভানহো’ উপন্যাস লিখেছিলেন স্কট। ‘আইভানহো’ কাহিনী একই সঙ্গে প্রেম ও বীরত্বের কাহিনী। সে প্রেম বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের মতো ত্রিমুখী প্রেম। ইংল্যান্ডের রাজা রিচাসের রাজত্বের সমকালে ইংল্যান্ডে যে ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ হয়েছিল তারই পটভূমিতে লিখা হয়েছে ‘আইভানহো’ এই উপন্যাসকে স্কটের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সফল উপন্যাস বলা হয়।
বাংলা সাহিত্যে ঔপন্যাসিক ওয়াল্টার স্কটের প্রভাব--
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে স্কটের প্রভাব যথেষ্টই ছিল। আমরা জানি উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলায় উপন্যাস লিখার প্রয়াস শুরু হয়। বঙ্কিমচন্দ্র তার সফলতম প্রথম সফল স্রষ্টা। তার উপর ওয়াল্টার স্কটের প্রভাব এতটায় বেশি ছিল যে বঙ্কিমচন্দ্রকে ‘বাংলার স্কট’ বিশেষণ দেওয়া হয়েছিল সে যুগে।
স্কটের যে বৈশিষ্ট্যগুলি বঙ্কিমচন্দ্রকে অনুপ্রাণিত করেছে সেগুলি হল—
এক: অতীত গৌরবের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা।
দুই: মানবতা বোধ।
তিন: ইতিহাসের সঙ্গে কল্পনার মিশ্রণ।
চার: মিথ বা অতিকথা কেন্দ্রিক ঘটনার ব্যবহার।
স্কটের মতো বঙ্কিমচন্দ্রও অত্যন্ত ইতিহাস প্রিয় মানুষ ছিলেন। স্কটের ‘ওয়েভারলি’ এবং ‘আইভানহো’ এই দুই উপন্যাস বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ ও ‘রাজসিংহ’ উপন্যাসকে প্রভাবিত করেছে। ত্রিমুখী প্রেমের দ্বন্দ্ব উভয়ত্বই রয়েছে। আর ব্যক্তি বিশেষ শারীরিক ও মানসিক বলের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন দুজনই। বঙ্কিমচন্দ্র ইংরেজি উপন্যাসের পাঠক ছিলেন এবং তার পাঠ্য তালিকায় স্কটের উপন্যাস সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র ছাড়া রমেশচন্দ্র দত্তের মতো উপন্যাসিকও কিছু পরিমাণে ওয়াল্টার স্কটের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। স্কটের উপন্যাসের মৌলিক সূত্রগুলি বাংলা উপন্যাসের প্রথম পর্বে শ্রদ্ধার সঙ্গে গৃহীত হয়েছে।
