রোমান্টিক অতীন্দ্রিয় কবি স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজ
কবি স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজ:
ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগকে রোমান্টিক যুগ বলা হয়। কোলরিজের সাহিত্য জীবন কেটেছে এই যুগপরিধির মধ্যে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দশক থেকে তরুণ কোলরিজ সাহিত্য সৃষ্টির কাজে ব্যাপ্ত ছিল। তিনি ফরাসি বিপ্লবের সমর্থক ছিলেন। ১৭৯৪ খ্রিষ্টাব্দে রবাট সাদি / সাদে এবং ১৭৯৬ খ্রিষ্টাব্দে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়। ১৭৯৮ খ্রিষ্টাব্দে কোলরিজের জীবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বছর রচিত হয় তাঁর ‘দি রাইম অফ দি অ্যানশেন্ট ম্যারিনার’ কাব্যটি এবং এই বছরই প্রকাশিত হয় ‘দি লিরক্যাল ব্যালাড্স’-এ কাব্যগ্রন্থে ওয়ার্সওয়ার্থের পাশাপাশি কোলরিজের চারটি কবিতা ছিল।
মানসিক দিক থেকে কোলরিজ ছিলেন ওয়ার্ডসওয়ার্থ, শেলি প্রমুখ রোমান্টিক কবিদের চেয়ে খানিকটা আলাদা। রোমান্টিসিজমের মূল শর্ত ছিল প্রেম, প্রকৃতিবোধ, সুদূর তৃষ্ণা, সৌন্দর্যমগ্নতা, বিষন্নতাবোধ, বিস্ময়বোধ ইত্যাদি। কোলরিজের ছিল আর একটি অতিরিক্ত চেতনা সেটি হল অতীন্দ্রিয় চেতনা। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের আড়ালে বিরাজ করছে আর একটি ভুবন। সেই ছায়াচ্ছন্ন মায়ার জগতের কথা ফুটে উঠেছে তাঁর কাব্যে। রোমান্টিকতার মূল লক্ষণ ইন্দ্রিয় মগ্নতার পাশাপাশি অতীন্দ্রিয়তা যে হতে পারে, কোলরিজ তা প্রমাণ করেছে।
ছেলেবেলা থেকে কল্পনা প্রবণ মানুষ ছিলেন কোলরিজ। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন তিনি। তরুণ বয়সে ওয়ার্ডসওয়ার্থে ও সাদির সঙ্গে বন্ধুত্বের সূত্রে তাঁকে কাব্যের মধ্যে আবদ্ধ রেখেছিল। তবে কোলরিজের মধ্যে সাহিত্য নেশা ছিল অত্যন্ত প্রবল। সেই নেশার জগৎ তাকে মাঝে মাঝেই নিয়ে যেত লৌকিক থেকে অতিলৌকিক জগতে। অনেক দেখা দৃশ্য, অনেক রহস্যময় ছায়ার আনাগোনা নিজের চারদিকে অনুভব করতেন কোলরিজ। অনেক সময় হারানো অতীত যেন প্রাণ নিয়ে উঠে আসত তার বর্তমানের কল্পনা রূপে। এই সূত্রে তিনি লিখেছিলেন দি অ্যানশেন্ট ম্যারিনার (The Ancient Mariner), খ্রিস্টাবেল (Christabal) প্রভৃতি অসাধারণ কাব্যগ্রন্থ।
দি অ্যানশেন্ট ম্যারিনার (The Ancient Mariner)
‘দি রাইম অফ দি অ্যানশেন্ট ম্যারিনার’ কাব্যে এক অলৌকিক জলযাত্রার কাহিনি আছে। দক্ষিণ মেরুর দিকে চলেছে একটি জাহাজ, সেই জাহাজের যাত্রীদের মধ্যে সামুদ্রিক প্রাণীদের নিয়ে অনেক ভৌতিক, অতিলৌকিক ঘটনা ঘটেছে। কাহিনিতে দেখা যায় এক নাবিক এক সমুদ্র পাখিকে হত্যা করেছিল তারই অভিশাপে সমস্ত অলৌকিক ঘটনার সূত্রপাত। কোনো কোনো সমালোচকের মতে ‘অ্যানশেন্ট ম্যারিনার’ই কোলরিজের শ্রেষ্ঠ কাব্য।
খ্রিস্টাবেল (Christabal)
১৮১৬ খ্রিষ্টাব্দে লেখা খ্রিস্টাবেল (Christabal)-এর কাহিনী হল—এক সুন্দরী অভিজাত তরুণী খ্রিস্টাবেল। তার পিতার নাম লিওলাইন। খ্রিস্টাবেল স্বপ্ন দেখল তার প্রেমিক বিপন্ন। সে রাত্রেই খ্রিস্টাবেল মাতা মেরীর কাছে প্রার্থনা করতে বসল। অন্যদিকে জিরেলডাইন সুন্দরী রমণীর ছদ্মবেশে খ্রিস্টাবেলের কাছে এসেছিল। এই জিরেলডিন সুন্দরীর ছদ্মবেশে এলেও খ্রিস্টাবেলের বাড়ীর কুকুর তাকে চিনতে পারে এবং তাকে প্রতিহত করার চেষ্টা করে। অন্যদিকে খ্রিস্টাবেলের মা-এর মৃত আত্মা জিরেলডাইনকে প্রতিহত করতে চায়। এইভাবে দুই অতীন্দ্রিয় শক্তির লড়াই চলছে খ্রিস্টাবেল (Christabal) কাব্যগ্রন্থে। সমস্ত কাহিনীকে কোলরিজ নিয়ে গেছে মধ্যযুগের পটভূমিতে। ফলে কাহিনীর আকর্ষণ আরও নিবিড় হয়েছে পাঠকের হৃদয়ে।
‘কুবলা খান’ (Kubla Khan)
কোলরিজ ছিল চিত্র রূপময় কবি। কথার ছবিকে তিনি অসাধারণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন তার অসংখ্য কবিতায়। ‘কুবলা খান’ (Kubla Khan) তার আর একটি নিদর্শন। কথিত আছে কাব্যের সমস্ত কাহিনীটি তিনি পেয়েছেন স্বপ্ন জগৎ থেকে। শোনা যায় Purchas’s Pilgrimage গ্রন্থটি পড়তে পড়তে কোলরিজ একসময় তন্দ্রাচ্ছন্ন হয় সেই তন্দ্রার মধ্যে তিনি কুবলা খান কাহিনী দেখেন। তারপর জেগে উঠে লিখেছিল এর কিছুটা অংশ।
রোমান্টিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুভব হল অতৃপ্তি। কোলরিজের সমস্ত জীবনটি এক অতৃপ্তির সমাহার। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি। নাটক লিখেছিলেন, প্রবন্ধও লিখেছিল। ফরাসি বিপ্লবের প্রতি সমর্থন জানিয়ে লিখেছিলেন ‘France: An Ode’। কোলিজের একটি বিখ্যাত সাহিত্য সমালোচনার গ্রন্থ পৃথিবী বিখ্যাত হয়েছিল। তার নাম ‘Biographia Literaria’। শেক্সপিয়ারের নাটক সম্পর্কে কোলিজের মূল্যায়ন প্রকাশিত হয় Notes and Lectures Upon Shakespeare প্রবন্ধে। সুতরাং একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় কোলরিজ কেবল যে অতীন্দ্রিয়ের কবি ছিলেন তা নয়। কবিতার রাজ্যে অতীন্দ্রিয়তা থাকলেও গদ্য সাহিত্যে তিনি সচেতন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য মনের পরিচয় দিয়ে গেছেন।
