ন্যাচারিলিজম (Naturalism)
সাহিত্যাদর্শের ক্ষেত্রে দুটি পদ্ধতি সাধারণভাবে স্বীকৃত। এই দুটি ভাবাদর্শকে যথাক্রমে ভাববাদী এবং বস্তুবাদী বলা হয়েছে। যে লেখকের রচনা আবেগ নির্ভর বা রোমান্টিক প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ তাদের বলা হয় ভাববাদী লেখক। এঁরা সর্বদাই কলাকৈবল্যবাদে বিশ্বাসী, অর্থাৎ তাদের রচনায় বাস্তব ও কল্পনার মেলবন্ধন ঘটে থাকে।
অন্যদিকে যে শিল্পী বাস্তব জীবনকে প্রাধান্য দেন, অর্থাৎ বাস্তব জীবনের সুখ-দুঃখ আঘাত-সংঘাত যেখানে প্রাধান্য পায় সেখানেই তিনি বাস্তববাদী। এই দুটি পৃথক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সমন্বয় না ঘটলে সৃষ্টি কখনই সার্থকতা পায় না।
বাস্তববাদিতার কিছু রকমফেরই হল যথাস্থিতবাদ বা ন্যাচারিলিজম। বাস্তববাদের সঙ্গে সামাজিক প্রভাবকে একসূত্রে গেঁথেই শিল্প সৃষ্টি করাই যথাস্থিতবাদের লক্ষ্য। প্রাণী হিসাবে মানুষকে প্রাকৃতিক জগতের পরিবেশে বিচার করা এবং যুক্ত করাই ন্যাচারালিজমের প্রধান উদ্দেশ্য। ভাববাদীদের চেয়ে জীবনকে আরও নিখুঁত করে তুলে ধরতে চান এই ন্যাচালিস্টরা। বিষয়বস্তু নির্বাচনে এবং প্রকাশভঙ্গীতে তাদের স্বকীয়তা অবশ্যই লক্ষণীয়। সমালোচক M.H. Abrams বলেছেন- ‘‘Naturalism is not only, like realism, a special selection of subject matter, it is a mode of fiction that was developed by a school of writers in accordance with a special philosophical thesis.” অর্থাৎ চিন্তাভাবনার দিক থেকে গঠে উঠেছিল একটি গোষ্ঠী যাঁদের ভাবনা বিশেষ দার্শনিক ভিত্তির ওপরেই প্রতিষ্ঠিত ছিল।
এই বিশেষ মতবাদটি গড়ে উঠেছিল ডারউইন পরবর্তী জীববিদ্যাকে নির্ভর করে, উনবিংশ শতকের মধ্যভাগে। এঁরা বিশ্বাস করতেন মানুষ প্রকৃতির অংশ মাত্র। তার কোন আত্মা বা ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক ভাবনা নেই। অন্যান্য জীবের মতই মানুষ দেহসর্বস্ব। মানুষ উচ্চতর জীব ছাড়া আর কিছুই নয়। তাদের চরিত্রও নির্ধারিত হয় প্রাকৃতিক প্রভাব এবং বংশগত ধারার দ্বারা। তাছাড়া পরিবেশও মানুষের চরিত্র গঠনের অন্যতম উপাদান। মানুষের জীবন মূলত ক্ষুধা ও যৌনতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব এবং পারিবারিক প্রভাবও তার ওপর ক্রিয়াশীল। এই সমস্ত প্রভাবের মধ্যে দিয়েই গড়ে ওঠে মানব চরিত্র। মানুষের এই জৈবিক জীবনের পরিচয়টি তুলে ধরাই ন্যাচারিলিজমের মূলকথা। মানুষের জীবনের প্রাত্যহিক আঘাত-সংঘাত, মানব প্রকৃতির অতি তুচ্ছাতিতুচ্ছ সমস্যা প্রভৃতি অতিবিশ্বস্ততার সঙ্গে বিচিত্র হয়ে থাকে ন্যাচারালিস্টদের লেখনীতে।
ফরাসি ঔপন্যাসিক এমিল জোলা (Emile Zola) ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে এই বিশেষ মতবাদটিকে প্রচার করেন le roman experimental বা the novel organized in the mode of a scientific experiment, জোলার পরবর্তী লেখকগণ বাস্তব বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি নিয়েই সাহিত্য রচনা করেছেন। তাঁরা খোলাখুলিভাবে চিকিৎসা শাস্ত্র নির্ভর শারীরিক ক্রিয়াকর্মকেই প্রাধান্য দিয়েছেন যা এর আগে সাহিত্যে স্থান পায়নি। তাদের রচনায় মানুষের জৈবিক প্রবৃত্তি, পশুধর্মী যৌনাচার প্রাধান্য পেয়েছে। এই সমস্ত ন্যাচারালিস্টিক উপন্যাস সাধারণত বিয়োগান্ত হয়ে থাকে (tragic)। অবশ্য এগুলি কোনমতই এলিজাবেথিয়ান ট্র্যাজেডির সমকক্ষতা পেতে পারে না।
এককথায় বলা যায় বাস্তব জীবন এবং আরণ্যক প্রকৃতির বুকে মানুষের পশু প্রকৃতির উন্মোচন করাই ন্যাচারালিস্টিক সাহিত্যের উদ্দেশ্য। বাংলা সাহিত্যও কিছু কিছু যথাস্থিতবাদ নির্ভর রচনা আছে। হয়তো সাধারণভাবে সেগুলিকে বাস্তববাদী সাহিত্য বলেও আখ্যা দেওয়া যায়। শৈলজানন্দের ‘কয়লাকুঠি’, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ে ‘শহরতলী’, সমরেশ বসুর ‘গঙ্গা’, অদ্বৈতমল্ল বর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ রচনাগুলিতে যথাস্থিতবাদ আদর্শে রচিত কাহিনি বলা যেতে পারে। অবশ্য কোথাও কোথাও ন্যাচারালিস্টরা শালীনতার সীমা অতিক্রম করে মানুষের পশু প্রবৃত্তিকেই বড় করে দেখিয়ে থাকেন।
