সংস্কৃত গদ্যকাব্যে বাণভট্টের অবদান
বাণভট্ট:
বাণভট্ট সংস্কৃত গদ্যকাব্যের দরবারে রাজাধিরাজ। কালিদাস যেমন সংস্কৃত কাব্যের জগতে উচ্চশিখরে অধিষ্ঠিত, বাণভট্টও তেমনই গদ্যকাব্যের (Prose Romance) ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মহিমায় মণ্ডিত। তাঁর আলোকসামান্য সৃষ্টি নৈপুণ্যে সংস্কৃত গদ্যকাব্য মহনীয় গুণগরিমায় ও চমকপ্রদ উৎকর্ষে মহিমান্বিত হয়ে ওঠে।
হর্ষচরিত:
হর্ষচরিত ঐতিহাসিক গদ্য রচনা। এতে ইতিহাস প্রসিদ্ধ সম্রাট (খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দী) হর্ষবর্ধনের রাজবংশের জন্মবৃত্তান্ত, রাজনৈতিক অভিযান, যুদ্ধযাত্রা ও বীরত্বব্যঞ্জক নানান ঘটনার অবতারণা করে লেখক হর্ষবর্ধনের মহিমা বর্ণনা করেছেন। আটটি উচ্ছ্বাসে বিভক্ত আখ্যায়িকাধর্মী এই রচনাটি হর্ষবর্ধন ও মরণোন্মুখী ভগিনী রাজ্যশ্রীর কাহিনি বর্ণনা করে অপ্রত্যাশিতভাবে সমাপ্ত হয়েছে।
কাদম্বরী:
বাণভট্টের কাদম্বরী সর্বশ্রেষ্ঠ কথাজাতীয় গদ্যকাব্য। কল্পনার স্বাধীনতায়, বর্ণনায় স্বচ্ছন্দাচারিতায় এবং প্রতিভার দীপ্তিতে কবি তাঁর এই কাব্যকে বিচিত্রতায় পূর্ণ করে তুলেছেন। ‘কাদম্বরী’ শব্দের অর্থ সুরা। সুরার মাদকতায় মানুষ আনন্দে বিভোর হয়। কাদম্বরীর রসামৃত পান করে পাঠক সমাজ আনন্দে আত্মহারা। তাই আহারে রুচি নেই। সেই কারণে বলা হয়—“কাদম্বরীরসজ্ঞানামাহারেহপি ন রোচতে।” এই গদ্যকাব্যের দুটি ভাগ—১) পূর্বভাগ, ২) উত্তরভাগ। পূর্বভাগ বাণভট্টের লেখা। এতে তিনটি অংশ রয়েছে—ক) কথামুখ্ম, খ) শুকপাখির আত্মকথা, গ) কাদম্বরীর মূল অংশ। বানভট্টের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ভূষণভট্ট বা পুলিন্দ ‘উত্তরভাগ’ লেখেন।
সংস্কৃত গদ্য সাহিত্যের জগতে বাণভট্ট কবি সার্বভৌম। শ্লেষ, শব্দগুম্ফনে, রসে, অলংকারে ও সদর্থ বিষয়ক কথাবর্ণনে বাণ যথার্থই—‘পঞ্চবাণস্তু বাণঃ।’ শ্রুতি, স্মৃতি, দর্শন, রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ, ব্যাকরণ প্রভৃতি শাস্ত্রে কবির পাণ্ডিত্যের পরিচয় পাই প্রতি পদে পদে। তিনি নিজেই হর্ষচরিতে বলেছেন—“সম্যক পঠিতঃ সাঙ্গো বেদঃ শ্রুতানি যথাশক্তি শাস্ত্রাণি।” এমন কোন বিষয় নেই যা বানভট্টের কাব্যদ্বয়ে নেই। তাই বাণের সম্বন্ধে এরূপ প্রবাদ প্রচলিত আছে—“বাণোচ্ছিষ্টং জগৎ সর্বম্।” বাণভট্ট ভাষাজগৎকে উচ্ছিষ্ট করে দিয়েছেন। কী বিষয়ে বর্ণনে, কী চরিত্রচিত্রণে, এমনকি প্রেমিক-প্রেমিকার মিলন-বিরহের বাস্তব চিত্র উপস্থাপনে—সর্বত্রই বাণভট্টের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ শক্তি ও অনন্যসুলভ চিত্রগ্রাহিতার অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে।
