-->

'পতঙ্গ' প্রবন্ধের বিষয়বস্তু

'পতঙ্গ' প্রবন্ধের বিষয়বস্তু
'কমলাকান্তের দপ্তর' প্রবন্ধগ্রন্থের 'পতঙ্গ' প্রবন্ধের বিষয়বস্তু:

“কমালকান্তের দপ্তর” গ্রন্থের ভাব ও আঙ্গিক, বিষয় ও প্রকাশভঙ্গি—উভয়ক্ষেত্রেই ছিল যুগপ্রভাব। লোকশিক্ষক বঙ্কিমচন্দ্র প্রথাগত প্রবন্ধে গুরুর মতো তাঁর প্রবন্ধে শিক্ষাদানের ভঙ্গিতে মতামত প্রকাশ করতেন; কিন্তু এক্ষেত্রে তিনি সুহৃদের মও আন্তরিক ভঙ্গিতে, পাঠকের সমস্তরে নেমে এসে তাঁর কথা বলেছেন। এই গ্রন্থের প্রধান কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হল—স্বদেশ প্রেম, সমাজচেতনা, পুরাতনের নব-মূল্যায়ন, বাঙালিয়ানা ও হিন্দুত্বের প্রতি গভীর অনুরাগ, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ধারণার সমন্বয় সাধনের চেষ্টা আবেগ ও যুক্তিবাদিতার সহাবস্থান, আদর্শ স্থাপনের চেষ্টা এবং লেখক ব্যক্তিত্বের অন্তর্দ্বন্দ্ব। ‘আমার দুর্গোৎসব’ নিবন্ধে স্বদেশপ্রেমের আবেগ শিল্পরূপ লাভ করেছে। স্বদেশ প্রেম ও সমাজ সচেতনতা আবার ওতপ্রোতভাবে জড়িত, যা ‘আমার দুর্গোৎসব’, ‘মনুষ্যফল’, ‘একটি গীত’ বা ‘বিড়াল’ নিবন্ধে প্রকাশিত। পুরাতনের নবমূল্যায়ন রেনেসাঁ যুগের অন্যতম প্রধান লক্ষণ ছিল বলেই দুর্গামূর্তির নবব্যাখ্যা দিয়েছেন কমলাকান্ত। ইতিহাস চেতনার সূত্র ধরেই “কমলাকান্তের দপ্তর”-এ এসেছে বাঙালিয়ানা ও হিন্দুত্বের প্রতি বিশেষ অনুরাগের প্রসঙ্গ। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য আদর্শের সমন্বয়ও দেখা যায় কমলাকান্তের দপ্তর-এ। কারণ এর আঙ্গিকটি পাশ্চাত্ত্য সাহিত্যজাত Personal Essay-র প্রভাবজাত, কিন্তু এর বক্তব্য বাঙলার এক বিশেষ যুগের বিশেষ মানুষের আত্মকথন। এই সমন্বয় দপ্তরের হাস্যরসের ক্ষেত্রেও লক্ষিত। আবেগ ও যুক্তির দ্বন্দ্ব রেনেসাঁসের বৈশিষ্ট্য, যা এখানে কমলাকান্তের দর্শনভাবনায় মানবতাবাদের প্রসঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দর্শনভাবনায় কখনো তিনি যুক্তিবাদী কখনো নৈরাশ্য পীড়িত। তাঁর পরহিতব্রত কখনো উদার মানবতাকেন্দ্রিক, কখনো শুধু হিন্দুহিতব্রত।

‘পতঙ্গ’ প্রবন্ধটিতে যুগভাবনা ও নব আঙ্গিকের আলোয় দপ্তর আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ‘পতঙ্গ' প্রবন্ধের দুটি অংশ। প্রথমাংশে আফিমের প্রসাদে কমলাকান্ত পতঙ্গের ভাষা বুঝতে পেরেছেন এবং পতঙ্গের জীবনাদর্শ জেনেছেন। দ্বিতীয়াংশ তিনি মানুষের ভাষা বুঝতে পারেননি এবং সকল মানুষকে পতঙ্গ বলে বোধ হয়েছে। প্রবন্ধের শুরুতে পরিহাসের সুর থাকলেও মূল সুরটি কিন্তু গভীর তত্ত্ব জিজ্ঞাসা-সঞ্জাত নৈরাশ্যে বিধুর। যে কমলাকান্ত ‘আমার মন’-এ বলেছিলেন “বিদ্যা তৃপ্তিদায়িনী নহে, কেবল অন্ধকার হইতে গাঢ়তর অন্ধকারে লইয়া যায়।” তিনিই ‘পতঙ্গ’-ও বলেছেন—“ঈশ্বর কি, ধর্ম কি, জ্ঞান কি, স্নেহ কি?” তত্ত্ব জিজ্ঞাসায় ক্লান্ত কমলাকান্তকে যেন এই দুটি উক্তির মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়। এই দ্বিধাবিভক্ত মানসিকতা আমাদের সাধারণ লক্ষণ, যা আড্ডায় হয়তো ধরা পড়ে। বঙ্কিমের উপন্যাসে আমরা আদর্শবাদী, দৃঢ়চেতা বঙ্কিমকে পাই, কিন্তু “কমলাকান্তের দপ্তর”-এ আমরা বিভ্রান্ত, ক্লান্ত বঙ্কিমচন্দ্রকেও পাই।

‘পতঙ্গ’ প্রবন্ধে উপমার মূলে ছিল সক্রিয় গভীর তত্ত্বজিজ্ঞাসা ও দার্শনিক চিন্তা। নসীরামবাবুর বৈঠকখানায় বসে বাবুর দলাদলির গল্প শুনতে শুনতে উত্তেজিত কমলাকান্ত বেশি মাত্রায় আফিম খেয়ে ফেলে হঠাৎ দিব্যকর্ম প্রাপ্ত হয়ে পতঙ্গের দীর্ঘ একোক্তি শুনেছেন। এই প্রবন্ধে কমলাকান্ত বেশির ভাগ সময়টাই চুপ করে থেকেছেন, নসীরামবাবুও পতঙ্গ কথা বলেছে, এর প্রেক্ষিতে কমলাকান্ত ডুব দিয়েছেন তাঁর ভাবনার গভীরে। পতঙ্গের আগুনে পুড়ে মরার বৈশিষ্ট্যের সূত্রে তিনি গেঁথেছেন মানবজীবনের প্রবৃত্তিগত অসহায়তাকে। অমোঘভাবে আমরা যে ধ্বংসের অভিমুখে যাচ্ছি, প্রবৃত্তির এই চক্রব্যূহ থেকে বেরোবার পথ খুঁজে পাননি বলেই হতাশ হয়েছে কমলাকান্ত।

প্রাবন্ধিক পিতলের পিলসুজের মেটে প্রদীপের শিখা থেকে সভ্যতার পথ ধরে ফানুসে প্রবেশ পর্যন্ত বাস্তব ইতিহাস তুলে ধরে পতঙ্গের বক্তব্যকে আমাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন। পরের অনুচ্ছেদে যুক্তির থেকে দাম্পত্য কলহের সুরটি যেন বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। তাই মেয়েলি ঢঙে পতঙ্গ এখানে গজগজ করেছে—“দেখ, পুড়িয়া মরিতে আমাদের রাইট আছে—আমাদের চিরকালের হক।” রাইট, হক শব্দের ব্যবহারে, সহমরণ প্রথার উল্লেখে পতঙ্গ মানবজীবনের, বিশেষত: স্ত্রীজাতির আরও কাছাকাছি চলে এসেছে। কলহের সুরটি বজায় রেখে অতি সূক্ষ্ম ও প্রচ্ছন্ন ভাবে হিন্দু নারীর থেকে সমগ্র স্ত্রী জাতির প্রসঙ্গে চলে গেছে পতঙ্গ। পরের অনুচ্ছেদে পতঙ্গ ও স্ত্রীজাতির তুলনা আছে।

“আমরা কেবল পুড়িবার জন্য পুড়ি, মরিবার জন্য মরি। স্ত্রী জাতিতে পারে?”

এর পরের তিনটি অনুচ্ছেদে বঙ্কিমচন্দ্র গভীর আকুল আবেগ সঞ্চারিত করেছেন পতঙ্গের বক্তব্যের মাধ্যমে। আসলে প্রবৃত্তির অমোঘ আকর্ষণকে যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করা কঠিন, তাই তাকে সঞ্চারিত করতে হয় আবেগের পথ ধরে। প্রবন্ধের শেষে তাই একই সুরে কমলাকান্ত বলেছেন বহ্নি, ঈশ্বর, ধর্ম, জ্ঞান, স্নেহ কি তিনি জানেন না। “তবু সেই অলৌকিক অপরিজ্ঞাত পদার্থ বেড়িয়া বেড়িয়া ফিরি।” ফলে আবেগ যন্ত্রণা, নৈরাশ্যের প্রেক্ষিতে পতঙ্গের সঙ্গে সহমর্মী হয়ে ওঠেন কমলাকান্ত তথা সমগ্র মানবজাতি। আবেগঘন এই উপলব্ধির মাধ্যমে এই উপমাজাত আবেদন পৌঁছে যায় হৃদয়ের কাছে। এখানে বক্তা পতঙ্গটি বাধা পেয়ে ফিরে এসেছিল কিন্তু বলে গিয়েছিল—“ভাল থাক- আমি ছাড়িব না—আবার আসিতেছি।” পতঙ্গ উড়ে গেছে এবং প্রবন্ধ থমকে দাঁড়িয়েছে এইখানে। কিন্তু কমলাকান্তের ঘোর এখনো কাটেনি, তখনই নসীরামবাবুর ডাকে কমলাকান্ত সম্পূর্ণ আচ্ছন্নতা থেকে অর্ধচ্ছিন্ন অবস্থায় ফিরে এলেন। কিন্তু পতঙ্গের বক্তব্য আবেগের পথ ধরে চৈতন্যের এমন গভীরে পৌঁছে গিয়েছিল যে নসীরামবাবুর জায়গায় তিনি একটি বিরাট পতঙ্গকে দেখতে পেলেন; ততক্ষণে মানবভাষা তাঁর কাছে দুর্বোধ্য হয়ে গিয়েছিল। কমলাকান্তের সত্তা তখন পতঙ্গ সত্তায় পরিণত।

এরপর কমলাকান্তের মনে হয়েছে—“...মনুষ্যমাত্রেই পতঙ্গ।” তবে মানুষ যা চায় তা সে পায় না অর্থাৎ কাচের আবরণ হল কাম্যবস্তু লাভের পথে প্রতিবন্ধকতা। কমলাকান্তের মতে “কাচ না থাকিলে সংসার এতদিন পুড়িয়া যাইত”। কারণ কাম্যবস্তু পেলে অন্বেষণ ফুরিয়ে যায়, মনুষ্যজীবন হয় নিরর্থক। আবার কাম্যবস্তু না পেলে অতৃপ্তির আকুলতা, অপ্রাপ্তির যন্ত্রণা জাগে। প্রবন্ধের শেষে দেখি না জানার যন্ত্রণা কমলাকান্তকে অস্থির করেছে। তবু না জানার অস্থিরতায় তিনি অপেক্ষাকৃত সুখে আছেন; সব জানার দুঃখ তাকে স্থবির করে দেবে। অর্থাৎ আকর্ষণে শুধু খুঁজে যেতে হবে—এখানেই বঙ্কিমের রোমান্টিক মনটিকে স্পর্শ করা যায়। জীবনের সংজ্ঞা যদি হয় ‘অনন্ত যন্ত্রণাময় অন্বেষণ’ তাহলে, সাহিত্যের সংজ্ঞা হবে ‘অনন্ত যন্ত্রণার ইতিহাস'। এরপর কমলাকান্ত ধর্মবহ্নি ও জ্ঞান-বহ্নিকে দগ্ধ হবার বাস্তব কটি উদাহরণ দিয়ে তিনি সাহিত্য-প্রসঙ্গে চলে গেছেন।

শ্রীচৈতন্যদেব ধর্মবহ্নির জ্বালা বুকে বয়ে বেড়িয়েছেন, কিন্তু সাধারণ ধর্মবিৎ জ্ঞান বা বুদ্ধি রূপ কাচের আবরণে বাধা পেয়ে বেঁচে যান। সক্রেটিস বা গ্যালিলিও জ্ঞানবহ্নির আকর্ষণে শেষ পর্যন্ত মৃত্যু বরণ করেছিলেন। কিন্তু বহু জ্ঞানী ব্যক্তি সমাজব্যক্তির অনুশাসনের কাছে বাধা পেয়ে ফিরে আসেন ও বেঁচে যান। কমলাকান্তের মতে মনুষ্য জীবনের বহ্নির দাহ কাব্যে বর্ণিত। যেমন মহাভারতের মান-বহ্নিতে দুর্যোধনরূপী পতঙ্গ পুড়ে মারা গিয়েছিলেন। স্নেহবহ্নিতে সীতাপতঙ্গের দাহ হয়েছিল রামায়ণে। জ্ঞানবহ্নিজাত দাহের গীত Paradise lost ধর্মবহ্নির অদ্বিতীয় কবি সেন্ট পল। ভোগবহ্নির পতঙ্গ অ্যান্টনি ক্লিওপেট্রা, রূপবহ্নির রোমিও-জুলিয়েত ঈর্ষাবহ্নির ওথেলো। ইন্দ্রিয় বহ্নি জ্বলছে। “গীতগোবিন্দ’ ও ‘বিদ্যাসুন্দর’-এ।

পতঙ্গরূপী মানুষের সামনে কমলাকান্ত দুটি পথ খোলা আছে দেখেছেন—হয় পুড়ে মরা, নয় ফিরে যাওয়া। হয় তত্ত্বজিজ্ঞাসায় ঝাঁপ দেওয়া, নয়তো তত্ত্বজিজ্ঞাসা থেকে নিবৃত্ত হওয়া। কমলাকান্ত কোনো পথটিকেই পাঠকের উপর চাপিয়ে দেননি। কারণ ব্যক্তিগত প্রবন্ধে লেখক তাঁর মত জবরদস্তি মূলকভাবে পাঠকের উপর চাপিয়ে দেন, কারণ তাতে আন্তরিকতা নিষ্পেষিত হয় নৈতিকতার চাপে। এখানেই প্রাবন্ধিক হিসাবে বঙ্কিমচন্দ্র অনন্য—স্বতন্ত্র।