লৌকিক সংস্কার ও লৌকিক বিশ্বাসে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরণ্যক উপন্যাস
লৌকিক সংস্কার ও লৌকিক বিশ্বাস : আরণ্যক উপন্যাস
উপন্যাসের পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ঔপন্যাসিক তাঁর উপন্যাসে অনেক সময় অলৌকিক উপাদান সন্নিবেশ করেন। অতীতের বিচিত্র আচার প্রকৃতির মধ্যে অতিপ্রাকৃত, বিশ্বাস ও তথা অলৌকিক উপাদানের সন্নিবেশ সহজসাধ্য হয়। ‘আরণ্যক’ উপন্যাসে অতিপ্রাকৃত ঘটনাও দৈবরহস্যের প্রয়ােগ ঘটেছে। অতিপ্রাকৃত ঘটনা ও দৈবরহস্যের প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরন্তন। লৌকিকবুদ্ধি দিয়ে বিচার করা সম্ভব নয়, এমন কিছু কিছু শক্তি মানুষের জীবনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। শেক্সপীয়রের হ্যামলেট জানিয়েছে—“There are many things in heaven and earth, than are dreamt of in your Philosophy.' অনেক সময় জীবনের গভীর সত্যের উদঘাটনে লেখক অলৌকিক ঘটনার আশ্রয় গ্রহণ করে থাকেন। কিন্তু অলৌকিক ঘটনাকে চরিত্রের সঙ্গে এমনভাবে সঙ্গতিসাধন করতে হবে, যাতে পাঠকের বাস্তবতা বােধকে আঘাত না করে।
‘আরণ্যক’ উপন্যাসে অলৌকিক চিত্রের উপস্থিতি আমরা লক্ষ্য করি। ষষ্ঠ পরিচ্ছেদের প্রথম অধ্যায়ের বিবরণ এই প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে। জঙ্গলের বিভিন্ন অংশে সার্ভের কাজ চলায় কাছারি থেকে তিন ক্রোশ দূরে বােমাইবুরুর জঙ্গলে আমীন রামচন্দ্র সিংকে কিছুদিন থাকতে হয়েছিল। সেই রামচন্দ্র হঠাৎ পাগল হয়ে গেছে শুনে সত্যচরণ দলবল নিয়ে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেখানে উপস্থিত হয়ে আশরফি টিন্ডেলের কাছ থেকে সত্যচরণ জানতে পারলেন, একটি সাদা কুকুর এসে আমিনবাবুকে রাত্রে বিরক্ত করত। আসরফি রাত্রে আমিনবাবু কুকুরের লেজ ধরে আছেন, চিৎকার শুনে আলাে নিয়ে ছুটে গিয়ে দেখলেন, একটি মেয়ে ঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে দ্রুত জঙ্গলের দিকে চলে গেল। কুকুর নারীতে রূপান্তরিত হওয়ার এই রহস্যময় আখ্যান শুনে সত্যচরণ অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। আসরফি তার ঠাকুরদার মুখ থেকে শুনেছিল ‘ডামাবানু’ জীনপরীর আখ্যান। বােমাইতুরু পাহাড়ের ওপর বটগাছের তলায় তার ঠাকুরদা পর্ণিয়া থেকে কলাই বিক্রির টাকা নিয়ে ঘােড়ায় চড়ে জ্যোৎস্নারাতে ফেরার পথে বটতলায় অল্পবয়সী সুন্দরী মেয়েদের হাত ধরাধরি করে নাচতে দেখেছেন। লবটুলিয়া ছ-মাইল দূরে। গভীররাতে সেখানে মেয়ে মানুষের আসা সম্ভব নয়। সেখানকার তাঁবু তুলে রামচন্দ্র ও টিন্ডেলকে সদর কাছারিতে নিয়ে চলে এলেন সত্যচরণ।
এই ঘটনার ছ'মাস পরে ষাট-পঁয়ষট্টি বছরের এক বৃদ্ধ এবং তার কুড়ি-বাইশ বছরের ছেলে দেখা করে জানালাে, তারা জঙ্গলে খাজনা দিয়ে গরু-মহিষ চড়াবার ইজারা নিতে চায়। বােমাইবুর জঙ্গল খালি থাকায় তাতে কোনাে অসুবিধা হল না। কিন্তু মাসখানেক পর বৃদ্ধ লােকটি কাছারিতে এসে জানালাে, সে তার ঘর থেকে প্রায়ই মেয়ে মানুষ বের হয়ে যেতে দেখে। সে জানাল, কোনােদিন সে মেয়ের পরনে থাকে সাদা ধােয়া শাড়ি, কোনােদিন লাল, কোনােদিন কালাে। বৃদ্ধর ছেলে জানালেন, ক’দিন থেকে সে রাত্রে একটা সাদা কুকুর আসতে দেখে। দিন তিনেক পর সত্যচরণ খবর পেলেন বােমাইবুরুর জঙ্গলে বৃদ্ধ ইজারাদারের ছেলেটি মারা গিয়েছে। সত্যচরণের ভীষণ ভয় হল। বনভূমিতে জ্যোৎস্নাভরা নৈশ প্রকৃতিকে তার রূপকথার রাক্ষসী রাত্রির মতাে মনে হল।
অষ্টম পরিচ্ছেদের তৃতীয় অধ্যায়ে সরস্বতী কুণ্ডীর বর্ণনা পাই। সরস্বতী কুণ্ডীর তিনদিকে ঘন বন। বনে আছে কত রকমের ফুল। কুণ্ডীর তীরে বনে পাখির সংখ্যাও খুব বেশি। সত্যচরণের মনে হয়েছে, এখানে মায়াবিনী বনদেবীর গভীর রাতে জ্যোৎস্নাস্নাত হ্রদের জলে জলকেলি করতে নামে। আমীন রঘুবর প্রসাদ সত্যচরণকে বলেছেন, সরস্বতী কুণ্ডী হল মায়ার কুণ্ডী; সেখানে রাত্রে হুরী পরীরা নামে; জ্যোৎস্না রাতে তারা তীরে পাথরের ওপর কাপড় খুলে রেখে জলে নামে জলকেলি করতে। জ্যোৎস্নার রাত্রে পরীদের মুখ জলের ওপর পদ্মফুলের মতাে জেগে থাকে। সত্যচরণ এই দৃশ্য না দেখলেও হেড সার্ভেয়ার ফতে সিং দেখেছেন। তারপর গভীর রাত্রে হ্রদের ধারে বনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন সার্ভে তাঁবুতে–পরদিন সকালে তার লাস কুণ্ডীর জলে ভাসতে দেখা গেছে। বড়াে মাছে নাকি তার একটা কান খেয়ে ফেলেছিল।
নবম পরিচ্ছেদের পঞ্চম অধ্যায়ে টাঁড়বারাে দেবতার মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। ফসল কাটার সময় ক্ষেতে বসে খাজনা আদায় করতে হয় সত্যচরণকে। সেজন্য কয়েকদিন সত্যচরণকে সেইসব শস্যক্ষেতের মধ্যে থাকার প্রয়ােজন হল। কাটুনি মজুরদের মতাে খুপড়িতে থাকতে হয় সত্যচরণকে। গনোরী তেওয়ারী এবং আরও অনেকে তাঁবুতে আসে। নানারকমের গল্প চলে। দশরথ সিং ঝান্ডাওয়ালা নামে রাজপুতের কাছে বুনাে মহিষের দেবতা টাঁড়বারাের আখ্যান শোনেন। এর আগে গানু মাহাততাও তাকে টাঁড়বারোর কথা বলেছিল। দশরথের কাছ থেকে সত্যচরণ জানতে পারেন, ছটু সিং-এর পরামর্শ মতাে ঢােলবাজ্যা জঙ্গল থেকে বুনাে মহিষ ধরে ব্যবসার পরিকল্পনা হয়েছিল, কিন্তু সব পরিকল্পনা ব্যর্থ করেছেন বুনো মহিষের দেবতা টাঁড়বারাে। টাঁড়বারাে একটাও মহিষ মারতে কিম্বা ধরতে দেন না। লবটুলিয়ার পাটোরিয়াও সত্যচরণকে জানাল, ছােটোবেলা থেকে তারাও টাঁড়বারাের আখ্যান শুনে আসতেন। অষ্টাদশ পরিচ্ছেদের প্রথম অধ্যায়ে সপ্তপর্ণের ঘন বনে দাঁড়িয়ে সত্যচরণের ভানুমতীকে দেখে বনদেবী বলে মনে হয়েছে। ভানুমতী সত্যচরণকে বন্যমহিষের রক্ষাকর্তা দেবতা টাঁড়বারাে গাছ দেখিয়েছেন। সত্যচরণ জানিয়েছেন, “...অনেক দূরে মােহনপুরা অরণ্যের কালাে সীমারেখার দিকে চাহিয়া এই অশ্রুতপূর্ব বনদেবতার কথা মনে হইলে শরীর যেন শিহরিয়া উঠিত।’’
গ্রামকেন্দ্রিক অরণ্য প্রকৃতির সঙ্গে লৌকিক বিশ্বাস ও লৌকিক সংস্কারের যােগ গভীর ও নিবিড়। অরণ্য প্রকৃতি আদিমতার সঙ্গে লােকজীবনের এইসব বিশ্বাস ও সংস্কৃতি একান্তভাবে সঙ্গতি সাধন করেছে।
বিভূতিভূষণের আগে অলৌকিক চিত্র শিল্প-সার্থকভাবে পরিবেশিত হয়েছে, এমন একটি উপন্যাসের নাম হল-বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা 'কপালকুণ্ডলা।
