-->

সাহিত্যে খেলা - প্রমথ চৌধুরী || আলোচনা

সাহিত্যে খেলা - প্রমথ চৌধুরী || আলোচনা

প্রমথ চৌধুরীর 'সাহিত্যে খেলা' প্রবন্ধের বিষয় বস্তু:

“আমি বাঙালী জাতির বিদূষক মাত্র। তবে রসিকতাকাচ্ছলে সত্য কথা বলতে গিয়ে ভুল করেছি। কারণ নিত্য দেখতে পাই যে, অনেকে আমার সত্য কথাকে রসিকতা বলে, আর আমার রসিকতাকে সত্য কথা বলে ভুল করেন।”
—নিজের সম্পর্কে এই উক্তিই প্রমথ চৌধুরীর স্বরূপকে অনুধাবন করা অনেকটাই সহজ হয়। সবুজপত্রের কাল থেকে তাঁর সাহিত্যিক জীবনের খবরাখবর কমবেশি সকলেরই জানা। বৃহত্তর সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পটভূমিতে তার পরিচয় আছে। বাংলা সাহিত্যে তাঁর সর্বজন স্বীকৃত বিশেষ অবদানটি হল সংস্কৃত শব্দভারে আড়ষ্ট বাংলা গদ্য মুক্তিতে চলিত ভাষার সফল প্রয়োগ। চলিত ভাষায় গদ্যের কায়া নির্মাণে প্রমথ চৌধুরী যেমন সিদ্ধহস্ত, তেমনি লঘুপরিহাসও তাঁর গদ্য সাহিত্যকে অনন্য মাত্র দান করেছে। বীরবলীয় ঢঙে লেখা তাঁর প্রবন্ধগুলিতে রয়েছে যুক্তিনিষ্ঠ তথ্যের সমাবেশ। বীরবলী গদ্যরচনার আর একটি সার্থক উদাহরণ ‘সাহিত্যে খেলা’।
‘সাহিত্যে খেলা’ সংক্ষিপ্ত গদ্যরচনাটি যদিও সাহিত্য-সম্পর্কেই লেখা, তবু এর লঘুছন্দ ও বাক্‌ভঙ্গি বীরবলী ঢঙের সবগুলি বৈশিষ্ট্যই ফুটিয়ে তুলেছে। রচনাটি ঠিক ‘রীতিমত প্রবন্ধ’ নয়, বেল্‌-লেত্যর-এর সুন্দর একটি নিদর্শন। তাঁর আসল বক্তব্য হ’ল সূত্রবদ্ধ অথচ অর্থগুঢ় একটি ছোট মন্তব্য—“সাহিত্য ছেলের হাতের খেলনাও নয়, গুরুর হাতের বেতও নয়।” এর মধ্যে সাহিত্য সম্পর্কে মূল্যবান কথাও আছে, কিন্তু তা তিনি বলেছেন রসের ছলে এবং মজলিশী মেজাজে। তিনি সাহিত্যের দ্বারা মনোরঞ্জন করতে বসে যেমন নটবিটের দলভুক্ত হতে রাজি নন, তেমনি গুরুগিরি করাও তার অভিপ্রেত নয়, আবার খেলাচ্ছলে শিক্ষা দেওয়ারও তিনি পক্ষপাতী নন, কারণ সরস্বতীকে তা হলে কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষয়িত্রীতে পরিণত করা হবে,—এতে তাঁর প্রবল আপত্তি। যদি কেউ এই লেখায় লেখকের সাহিত্য সম্বন্ধীয় মতামত জানতে চান, তা হলেও যে একেবারে ব্যর্থ হবেন, তা নয়, কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা এর আস্বাদন।
রচনাটি নিবন্ধ, বক্তব্যের সুদক্ষ বুনানির মধ্যে কোথায়ও ফাঁক নেই। কিন্তু প্যারাডক্স, শ্লেষ, বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য ও প্যাঁচালো ভঙ্গি রচনাটিকে অভিনবত্ব দিয়েছে। প্রতি ছত্রেই এই প্রোজ্জ্বল বুদ্ধি অসাধারণ কথকের মনের দীপ্তি ছড়িয়ে পড়েছে। বীরবলী গদ্য কথ্যভাষাশ্রয়ী, কিন্তু অনলঙ্কৃত নয়—শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কার তার চলতি গদ্যকেও লাবণ্যমণ্ডিত করেছে। এই অনবদ্য গদ্যরচনাটিতে কোথায়ও কষ্ট-কল্পনা নেই—অনেক বিষয়ের কথা বলেও তিনি ভারমুক্ত—মনের বিচিত্র লীলাস্পন্দন ছাড়া আর কি ? বিয়রবোম সম্পর্কে সম্পর্কে বলা হয়েছে: 'One of the charms of Max Beerbohm is that he never pretends to be what he is not.’ প্রমথ চৌধুরী সহজেই বলতে পেরেছেন: “আমরা যদি একবার সাহস করে কেবল মাত্র খেলা করবার জন্য সাহিত্য জগতে প্রবেশ করি, তা হলে নির্বিবাদে সে জগতের রাজা-রাজড়ার দলে মিশে যাব। কোনোরূপ উচ্চ আশা নিয়ে সে ক্ষেত্রে উপস্থিত হলেই নিম্নশ্রেণীতে যেতে হবে।”—নিজের অধিকারের সীমা সম্পর্কে তাঁর ছিল সুনির্দিষ্ট ধারণা, কিন্তু খেলা করার অধিকার কি সকলেরই থাকে? বেশীর ভাগই তো খেলতে এসে অখোলোয়াড়ী মনোভাব দেখান। কিন্তু চৌধুরী মহাশয় পেয়েছিলেন সাহিত্যে খোশমেজাজে খেলা করার সেই দুর্লভ অধিকার। এখানে প্রমথ চৌধুরী অনন্য। তা আমাদের মানতেই হয়।