-->

বনফুলের বুড়ীটা গল্পের বিশ্লেষণী পাঠ

বনফুলের বুড়ীটা গল্পের বিশ্লেষণী পাঠ

 বনফুলের বুড়ীটা:

জীবন রহস্যের সুলুক সন্ধানী বনফুলের ‘বুড়ীটা’ গল্পে সদ্য স্বাধীন ভারতবর্ষে চরম দারিদ্র্য, সামাজিক অবহেলা এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির অন্তঃসারশূন্যতা। অত্যন্ত সহজ ভাষায় একটি নিটোল ছোটগল্পের আদলে লেখক এখানে সমাজের এক রূঢ় ও নগ্ন বাস্তবকে তুলে ধরেছেন।

গল্পের প্রধান চরিত্রের কোনো নির্দিষ্ট নাম নেই। কথক ডাক্তারবাবু তাকে মনে মনে ‘পি. পি. (পার্মানেন্ট পাওনাদার) বলে ডাকলেও, তার আসল নাম লেখক আমাদের জানাননি। সে শুধুই একজন ‘বুড়ী’এই নামহীনতা আসলে চরম দারিদ্র্যের একটি প্রতীক। সমাজে যারা চরম অবহেলিত এবং প্রান্তিক, তাদের কোনো ব্যক্তি-পরিচয় থাকে না; সমাজ তাদের একটি সাধারণ পরিচয়ে (যেমনভিখারি, বুড়ি, পাগল) দেগে দেয়। লেখক ইচ্ছাকৃতভাবেই কোনো সুনির্দিষ্ট নাম ব্যবহার না করে তাকে সমগ্র দরিদ্র শ্রেণীর এক অমোঘ প্রতিনিধি করে তুলেছেন।

পুরো গল্পটির আবর্তন এই বৃদ্ধাকে ঘিরেই। তার প্রাত্যহিক আগমন, বেঁচে থাকার যন্ত্রণা, শীতের কষ্ট নিবারণের জন্য এক টুকরো কাপড়ের আকুতি, তার চরম দার্শনিক ‘মরণ’ কামনা এবং অবশেষে অন্য একটি বেওয়ারিশ মৃতদেহকে তার বলে ভুল করাসবকিছুর কেন্দ্রেই রয়েছে সেই বৃদ্ধা। চরিত্রকেন্দ্রিক নামকরণের রীতি অনুযায়ী গল্পের কাঠামোতে ‘বুড়ীটা’ নামটি সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত। গল্পে একদিকে আমরা দেখি দেশের প্রধানমন্ত্রীর (পণ্ডিত নেহেরু) নাম এবং তাঁর বিশাল রাজনৈতিক কর্মসূচি। তাঁর একটি সুনির্দিষ্ট, ক্ষমতাশালী এবং দেশজোড়া পরিচিতি আছে। ঠিক অন্যদিকে রয়েছে নাম-গোত্রহীন এক ‘বুড়ী’, যার বেঁচে থাকা বা শকুনের খাবারে পরিণত হওয়ায় রাষ্ট্র বা সমাজের কিছুই যায় আসে না। এই নামকরণের মাধ্যমেই লেখক ক্ষমতাশালী বনাম ক্ষমতাহীনের মধ্যকার তীব্র বৈপরীত্যটি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। গল্পের নামকরণের চূড়ান্ত সার্থকতা প্রমাণিত হয় একেবারে শেষ লাইনে এসে। যখন আসল বুড়ী আবার ফিরে আসে, তখন কথক বুঝতে পারেন যে, মাঠে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকা নারীটি অন্য কেউ, কিন্তু সে-ও আসলে এই সমাজেরই আরেকজন অবহেলিত ‘বুড়ী’

“শুকনো-ডাল হাতে বুড়ী আমাদের দেশে অনেক আছে।”

এই উপলব্ধির পর ‘বুড়ী’ আর কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি থাকে না, বরং সদ্য স্বাধীন ভারতের অগণিত বুভুক্ষু, বস্ত্রহীন এবং ঠিকানাহীন মানুষের এক সর্বজনীন রূপ হয়ে ওঠে।

গল্পের কথক বা ডাক্তারবাবু চরিত্রটি এই গল্পের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক, কারণ তাঁর চোখ দিয়েই আমরা পুরো ঘটনাটি দেখছি। ডাক্তারবাবুর মনস্তত্ত্ব আসলে তৎকালীন (এবং বর্তমান) শিক্ষিত, সচ্ছল মধ্যবিত্ত সমাজের মনস্তত্ত্বেরই একটি নিখুঁত আয়না। লেখক বনফুল খুব সচেতনভাবেই এই চরিত্রটি নির্মাণ করেছেন, যেখানে কোনো অতিরঞ্জন নেই।

ডাক্তারবাবু একজন সহৃদয় মানুষ। তিনি প্রতিদিন বুড়িকে একটি করে পয়সা দেন, চোখের অসুখে ওষুধ দেন, এমনকি তার সাথে মাঝে মাঝে কথাও বলেন। কিন্তু এই সহানুভূতির মধ্যে একটা নিরাপদ দূরত্ব বজায় থাকে। তিনি বুড়ির নাম দিয়েছেন ‘পি. পি.’ বা ‘পার্মানেন্ট পাওনাদার’যার মধ্যে একটু পরিহাস এবং তাকে একটি রুটিন বা অভ্যাসের অংশ হিসেবে দেখার মানসিকতা লুকিয়ে আছে। তিনি বুড়ির কষ্ট বোঝেন, কিন্তু সেই কষ্ট তাঁর নিজের জীবনকে খুব একটা বিচলিত করে না।

গল্পের অন্যতম মোড় হলো ডাক্তারবাবুর শীতের কাপড় দিতে ভুলে যাওয়া। বুড়ির কাছে ওই একটি খদ্দরের কাপড় ছিল জীবন-মরণের প্রশ্ন, আর ডাক্তারবাবুর কাছে তা ছিল স্রেফ একটি দাতব্য কাজ, যা ভুলে গেলে তাঁর নিজের কোনো ক্ষতি নেই। ব্যস্ততা এবং নিজস্ব আরামদায়ক জীবনের ঘেরাটোপে প্রান্তিক মানুষের তীব্র প্রয়োজন যে কতটা তুচ্ছ হয়ে যায়, ডাক্তারবাবুর এই বিস্মৃতি তারই প্রমাণ। এটি আসলে সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণীর এক ধরনের মানসিক ঔদাসীন্য।

যখন ডাক্তারবাবু দেখলেন শকুনে খুবলে খাওয়া মৃতদেহটি (তাঁর ধারণায়) ওই বুড়ির, তখন তাঁর মনে তীব্র অপরাধবোধ কাজ করে। কাপড়টা সময়মতো না দিতে পারার আক্ষেপ থেকেই তিনি প্রায়শ্চিত্ত করার তাগিদ অনুভব করেন। তাই পকেটের কুড়িটা টাকা দিয়ে তিনি মহাসমারোহে তার দাহ করার ব্যবস্থা করেন। এই কাজের মাধ্যমে তিনি আসলে নিজের বিবেককে সান্ত্বনা দেন এবং অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পেতে চান। মধ্যবিত্ত সমাজ এভাবেই অর্থ দিয়ে নিজেদের সামাজিক দায়বদ্ধতার ঋণ মেটাতে চায়।

গল্পের শেষে যখন আসল বুড়ি ফিরে আসে, তখন ডাক্তারবাবুর মনস্তত্ত্বে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা লাগে। তিনি উপলব্ধি করেন যে, ওই কুড়ি টাকা দিয়ে দাহ করা মৃতদেহটি তাঁর পরিচিত বুড়ির নয়, বরং অন্য কোনো ঠিকানাহীন বৃদ্ধার। এই মুহূর্তে তাঁর ব্যক্তি-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ভেঙে পড়ে। তিনি বুঝতে পারেন, এই সমাজে চরম দারিদ্র্য মানুষের ব্যক্তিগত পরিচয় মুছে দেয়। তাঁর এই উপলব্ধিশুকনো-ডাল হাতে এই ভারতবর্ষে অনেক বুড়ীই রয়েছে। আসলে মধ্যবিত্তের রোমান্টিক বা খণ্ডিত সমাজভাবনার মোহভঙ্গ।

ডাক্তারবাবু চরিত্রটি কোনো খলনায়ক নয়, বরং তিনি আমাদেরই প্রতিনিধি। তাঁর সদিচ্ছা আছে, কিন্তু সেই সদিচ্ছা সমাজ বদলানোর মতো শক্তিশালী নয়। তাঁর মনস্তত্ত্বের মধ্য দিয়ে লেখক আসলে আমাদের নিজেদের দিকেই একটি আয়না ধরেছেন, যেখানে আমরা আমাদের নিজেদের সহানুভূতি, উদাসীনতা এবং সীমাবদ্ধতাগুলো দেখতে পাই।

‘বনফুলের আরো গল্প’ গল্পগ্রন্থটি পাঠকে রবীন্দ্রনাথ বনফুলকে পত্রে জানিয়েছিলেন—“জগতের আনাচে-কানাচে আড়ালে-আবডালে ধুলিধূসর হয়ে আছে যারা, তুচ্ছতার মূল্যেই তাদের মূল্যবান করে দেখার কাজে কোমর বেঁধে বেরিয়েছে তোমাদের মতো বিজ্ঞানী মেজাজের সাহিত্যিক, তোমাদের সন্ধান জগতের অভাজন মহলে—তোমাদের ভয় পাছে তার অকিঞ্ছিৎকরত্বের বিশিষ্টতাকে ভদ্র চাদর পরিয়ে অস্পষ্ট করে ফেলো।”  বনফুল তাঁর গল্পে তুচ্ছ বিষয়কে নিলেও কৌতূহল দিয়ে তাকে অন্য স্বাদ দিয়েছেন। গল্পের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত কৌতূহল বজায় থাকে। সে কৌতূহল গল্পের ‘ফর্ম’ থেকে বিষয়ের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে এমন ব্যঞ্জনা আনে, যাতে পাঠকমন ঔৎসুক্য থাকে এই অর্থে—‘শেষ হয়ে হইল না শেষ’। এর এর সঙ্গে মিশে থাকে প্রচ্ছন্ন কৌতুক—তার নানান রকমফের শ্লেষ, ব্যঙ্গ, ব্যঙ্গোক্তি, নির্মল পরিহাস-রসিকতা ইত্যাদি সব কিছুই। বনফুলের ‘বুড়ীটা’ গল্পটিও এই বৈশিষ্ট্যগুলি থেকে বঞ্চিত নয়। এখানেই বনফুলের বিশিষ্টতা, এখানেই বনফুলের সার্থকতা। যা তাকে অন্যান্য গল্পকার থেকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে।