-->

শাক্ত নন তবু শাক্ত পদের সফল কবি // শাক্তপদ রচনায় মধুসূদন দত্তের কৃতিত্ব

শাক্ত নন তবু শাক্ত পদের সফল কবি  শাক্তপদ রচনায় মধুসূদন দত্তের কৃতিত্ব

শাক্তপদ রচনায় মধুসূদন দত্তের কৃতিত্ব:

বাংলা সাহিত্যে প্রাচীন এবং মধ্যযুগ বিকশিত হয়েছে প্রধানত ধর্মকে আশ্রয় করে। রামায়ণ, মহাভারত, মঙ্গলকাব্য ইত্যাদি সমস্তই ধর্মীয় কাব্য রূপে পরিচিত। এ সব কাব্যের কাহিনিতে যে চরিত্রগুলি আবর্তিত হয়েছে তারা প্রায় সকলেই স্বর্গের দেব-দেবতা নয়তো স্বর্গ ভ্রষ্ট মানুষ। এমনকি চৈতন্য জীবনী কাব্যেও রক্ত মাংসের মানুষ মহাপ্রভুকে আঁকা হয়েছে দেব কল্পনায়।

বৈষ্ণবদের কাছে বিষ্ণু সাধনা যেমন রাধাকৃষ্ণের সাধনা কিম্বা চৈতন্য আরাধনা মধ্য দিয়ে আবর্তিত হয়, শাক্তদের কাছে তেমনি শক্তি সাধনার দুটি স্তর—একটি হিমালয় দুহিতা উমা। শাক্ত সাধক কবিরা অর্থাৎ রামপ্রসাদ, কমলাকান্তের মত কালজয়ী কবিরা জগৎমাতার দুটি মূর্তিকেই এঁকেছেন। কিন্তু ষোড়শ শতাব্দীর বৈষ্ণব সাধনা গোষ্ঠীবদ্ধ ছিল এবং বৈষ্ণবীয় দর্শনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল, আর অষ্টাদশ শতাব্দীর শাক্ত সাধনা— ততটা নিয়ন্ত্রিত নয়। এখানে গোষ্ঠীবদ্ধ সাধনার চেয়ে একক সাধনায় বেশি দেখা গেছে। বৈষ্ণব কবিরা সাধারণত তাদের আখড়ার অধীনে থাকতেন। আর শাক্ত সাধকেরা অনেকই ছিল গৃহী। এমনকি রামপ্রসাদ নিজেও ছিলেন গৃহী। তাছাড়া চৈতন্যদেবের মত এত বড় মাপের কোন মানুষ শক্তি সাধনাকে দার্শনিক তত্ত্ব দিয়ে বাঁধেননি। তাই এককভাবে অনেকেই শাক্তপদ রচনা করেছেন যারা শাক্ত সাধক নন।

তাই শাক্তপদ বিচারের ক্ষেত্রে সাধক কবির লেখা আর সাধক নন এমন কবির লেখা এই দুই জাতীয় পদ বিশ্লেষণের অবকাশ আছে। অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ সময় পর্যন্ত লেখা শাক্তপদের তালিকা নির্ণয় করলে দেখা যাবে তার রচয়িতাদের মধ্যে অনেকেই আছেন রাজা, জমিদার, নায়েব, কবিওয়ালা নাট্যকার ইত্যাদি। ব্যক্তিগত জীবন বোধে তারা হয়তো কালীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল কিন্তু বৃহত্তর অর্থে তাদের সাধক রূপে পরিচিতি নেই। এই সূত্রে আমরা নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ, পাঁচালীকার দাশরথি রায়, আখ্যান কাব্যের কবি নবীনচন্দ্র সেন, কবিওয়ালা অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, জমিদার গোবিন্দ চৌধুরী, দেওয়ান নন্দকুমার রায় প্রমুখ কবির নাম করতে পারি।

এই সূত্রেই এক বিস্ময়কর প্রতিভার সামনে আসি আমরা। তিনি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। কোন অর্থেই তিনি শাক্ত কবি নন, এমনকি ধর্ম সম্পর্কে তার তেমন আকর্ষণ ছিল বলেও জানা যায় না। হিন্দু থেকে তিনি খ্রিষ্টান হয়েছিলেন নানা পারিপার্শ্বিক কারণে। এই কবির লেখা একটি সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা যেমন শাক্ত সাহিত্যের সম্পদ তেমনি সমগ্র বাংলা সাহিত্যের এক উৎকৃষ্ট  সৃষ্টি ‘বিজয়া দশমী’ নামে চিহ্নিত করা হয় এই সনেটটিকে। বিজয়া পর্যায়ের মা মেনকার হৃদয়ের আকুলতা অসাধারণ সাফল্যের সঙ্গে তুলে ধরেছেন কবি মধুসূদন দত্ত।

“যেয়ো না, রজনী, আজি ল’য়ে তারাদলে!”—মা মেনকার কষ্টের এই আকুল আর্তি দিয়ে কবিতার সূচনা। আর কবিতাটি শেষ হয়েছে—

“ কহিলা কাতরে

নবমীর নিশা-শেষে গিরীশের রাণী।”

এই বিবৃতির মাধ্যমে। কবিতাটির মধ্যে রয়েছে নাটকীয়তা। নবমীর রাত্রির কাছে মেনকার প্রার্থনা—এই রাত যেন না পোহায়। পোহালেই উমাকে চলে যেতে হবে। একমাত্র কন্যার পিত্রালয়ের আনন্দে যেন সোনার প্রদীপ জ্বলে উঠেছে। হিমালয় গৃহে মেনকার কাতর ক্রন্দন ফুটিয়ে তুলেছেন কবি—

“দ্বিগুণ আঁধার ঘর হবে,আমি জানি,

নিবাও এ দীপ যদি!”

চোদ্দ চরণের সংক্ষিপ্ত কাব্য রীতি যা সনেট নামে পরিচিত। সেই চোদ্দ চরণের সংহতির মধ্যে বৃহৎ ব্যথাকে ধরেছেন মধুসূদন দত্ত। সারাবছর মেয়ের আগমনের পথ চেয়ে বসে থাকেন মা। তারপর বিধির নিয়মে কন্যা আসে পিতৃগৃহে কিন্তু সুদীর্ঘ এক বছরের অদর্শনের কষ্ট তিন দিনের মিলনে পূর্ণতা পায় না। তাই মেনকার এমন আকুল আবেদন।

মধুসূদন শাক্ত কবি ছিলেন না। তিনি ছিলেন ভারতীয় পুরাণের ঐতিহ্যের প্রতি অনুরাগী কবি। মধুসূদন ছিলেন নবজাগরণের প্রতিভূ। নবজাগরণের চেতনার মধ্যে থাকে ঐতিহ্যের অনুবর্তন। মধুসূদনের সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে ঐতিহ্য প্রতি সক্রিয়। সেই সূত্রেই তিনি লিখেছিলেন এই অসাধারণ কবিতাটি যা বিজয়া দশমীর অনুভবকে ধারণ করে আছে। শাক্ত পদের তালিকা ভুক্ত হওয়ার জন্য তিনি এই কবিতা লেখননি—কিন্তু আপন গুণে কবিতাটি শাক্ত পদের শ্রেণিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে।