-->

ক্রেসিডা - বিষ্ণু দে

ক্রেসিডা কবিতার বিষয়বস্তু /  প্রেমের কবিতা হিসেবে বিষ্ণু দে-র ক্রেসিডা

ক্রেসিডা - বিষ্ণু দে

বিশ শতকের তিরিশের দশকে বাংলা কবিতায় মৌলিক রচনার গুণে যাঁরা খ্যাতি লাভ করেছিলেন কবি বিষ্ণু দে তাঁদের মধ্যে বিশিষ্ট। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কবিতার পার্থক্য তিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে চেয়েই কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন। বিষ্ণু দে-র প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উর্ব্বশী ও আর্টেমিস’-এ কথার সুস্পষ্ট প্রমাণ। প্রেম সম্পর্কে কবি বিষ্ণু দে ভিন্নতর দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেছেন। যেখানে নেই রবীন্দ্রানুসরণ এবং নেই অনেক কোন কবির ভাবধারার পুনরাবর্তনও। এক্ষেত্রে তিনি তাঁর আপন হৃদয়ের ভাব-ভাবনা অনুভূতিকে মেলে ধরেছেন। সমকালীন ক্লেদাক্ত পৃথিবীতে প্রেমের নির্ভরতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। এই অভিজ্ঞতা থেকেই প্রেমের প্রতি বিরূপতা। মনোবিজ্ঞান প্রেমের মায়াকাজল ধুয়ে মুছে দিয়েছে। তাই নাগরিক প্রেমের অসারতাকে তিনি বারবার পরিহাস করেছেন—

“অভ্যাস শুধু অভ্যাস, লিলি, তাই তো আসি

তোমার উচ্চ প্রেমের হাস্যচপল নীড়ে।”

এই অংশে প্রেমের মনহীন যান্ত্রিকতা প্রকাশ পেয়েছে। প্রেম যদি দেহের উপর নির্ভরশীল হয় তবে যৌবনাকাঙ্ক্ষা তো দেহকে অবলম্বন করেই। তাহলে তার ক্ষণস্থায়িত্ব রোধ করার উপায় কী? দেহে যখন বার্ধক্য আসবে, চর্ম হবে লোল—তখন তো প্রেমের মৃত্যু অবধারিত। তখন স্মৃতির মধ্যেও প্রেমকে বাঁচিয়ে রাখার সম্ভাবনা কম—

“সময়ের থলি শতচ্ছিদ্র বিস্মৃত-কীট কাটে।”

প্রেম সম্বন্ধে কবির যে মনোভঙ্গি এখানে প্রকাশিত হয়েছে তার সঙ্গে কবি সুধীন্দ্রনাথের মনোভঙ্গিরও সাদৃশ্য খুঁজে পাই। আবার বুদ্ধদেব বসুর মধ্যেও এধরণের মনোভঙ্গির প্রকাশ স্পষ্ট। এর নাম যুগধর্ম।

‘ক্রেসিডা’ প্রেমের কবিতা হিসাবে উল্লেখযোগ্য। ‘ওফেলিয়া’ কবিতায় ওফেলিয়া-হ্যামলেটের প্রেমের বিপর্যয়ের জন্য হ্যামলেট দায়ী। আর ক্রেসিডা-ট্রয়লাসের প্রেমের বিপর্যয়ের জন্য দায়ী ক্রেসিডা। একটিতে দায়ী পুরুষ আর অন্যটিতে নারী। অবশ্য উভয় ক্ষেত্রেই দায়িত্ব গিয়ে পড়েছে শেষ পর্যন্ত পরিবেশের উপর। হেলেনের প্রেমের উদ্ভূত ট্রয়ের যুদ্ধে ক্রেসিডা-ট্রয়লাসের প্রেম-কল্প ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ক্রেসিডা ডায়মিডিসের প্রতি প্রণায়সক্ত হয়ে ট্রয়লাসের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করলো—

“হেলেন প্রেমে আকাশ বাতাসে ঝঞ্ঝার করতাল।

দ্যুলোকে ভূলোকে দিশাহারা দেবদেবী,

কাল রজনীতে ঝড় হয়ে গেছে রজনীগন্ধা বনে।

বৈশাখী মেঘ মেদুর হয়েছে সুদূর গগণ কোণে,

কুরুক্ষেত্রে উড়েছে হাজার রথচক্রের ধূলি।

স্বপ্ন গোধূলি ডুবে গেল খর রক্তের কোলাহলে।”

আধুনিক জীবন হ্যামলেটের জীবনের মতো জটিল, সংগ্রাম মুখর বর্তমান যুগে প্রতি মুহূর্তেই ট্রয়ের যুদ্ধ সংগঠিত হচ্ছে; সুতরাং আমাদের প্রেম ও হ্যামলেট ও ট্রয়লাসের প্রেমের মতো খণ্ডিত হবে, এতে বিস্ময়ের কী আছে।

প্রেম খণ্ডিত হলেও প্রেমের প্রতি আকর্ষণ দুর্নিবার—

“এই তবে ভোরবেলা।

হে ভূমিশায়িনী শিউলী! আর কি

কোনো সান্ত্বনা নেই?”

প্রথম যৌবনের প্রেম নিষ্ঠাহীন শিউলির মতো শিথিল বৃন্ত হতে ঝরে পড়েছে। ধূলিলুণ্ঠিত, প্রেমের পাপড়িগুলি গেছে খসে, সময়ের আগ্নেয়-নিশ্বাস উবে গেছে তার রতি-পরিমল। ভবিষ্যৎহীন অন্ধকারে ক্রেসিডার খুল্লতাত প্যান্থারের মতো সহানুভূতি জানাবার কেউ নেই। একথা আমাদের জানা, তবু কি জীবনে কোনো সান্ত্বনা নেই! আছে—

“রজনীগন্ধা দিয়েছিলো সেই রাতে,

আজ তো সে ফোটে দেখি

মদীয় অধীর রাতের তন্বীফুল—

রজনীগন্ধা, বিরাগ জানে না সে কি?”

বহুদিন হোল প্রেমের পাত্রী পরপুরুষের অঙ্কশায়িনী। কিন্তু তাই বলে তার প্রেম মিথ্যে হয়ে যায়নি। প্রেমের পবিত্র স্মৃতি রজনীগন্ধার মতো আজও জীবনের অন্ধকার রাত্রিকে সুরভিত করে তোলে। অবশ্য প্রেমের স্মৃতির মধ্যে কেবলমাত্র উজ্জীবনী শক্তি আছে তা নয়, মৃত্যু তুল্য যন্ত্রণাও আছে।

কিন্তু যন্ত্রণার আগুনে পাখা পুড়িয়ে তবেই তা সম্ভব। অবিশ্বাসী প্রেমের আকস্মিক আঘাতে উন্মাদ হয়ে যাওয়ারই কথা। ট্রয়লাসও মর্মান্তিক যন্ত্রণায় দিশে হারা হয়ে পড়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অবিশ্বাসী প্রেমের তীব্র আঘাত জীবনধর্মের কাছে পরাজয় স্বীকার করেছে—

“তুই চ’লে গেলে মরণ মারীচ মায়াবীর ডাকে মূক

বলি ওষ্ঠাধারে।”

প্রেম আজ অপ্রাপনীয়। তাই প্রেমভাবনার সঙ্গে আনুষঙ্গিক গ্লানি জড়িয়ে নেই। সব খাদ পুড়িয়ে অন্তরের প্রেম দ্বিগুণ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে—

“কালের বিরাট অট্টহাসির ছায়া

ঢেকে দিয় ঢেকে তোমরও মরণ-মায়া—

হে মাতরিশ্বা, মহাশূন্যের সুখে

তুড়ি দিয়ে যাই তোমারও প্রবল মুখে।

তুমি ভেবেছিলে উন্মাদ ক’রে দেবে?

উদ্বায়ু আজো হয়নি আমার মন।”

আমাদের বুঝতে বাকি থাকে না—ট্রয়লাসের জীবন প্রত্যাখ্যান, আশাভঙ্গ ও আত্মবিলাপের মধ্য দিয়ে পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে ছেদ পড়েনি। ব্যক্তিগত ব্যর্থতাকে সে সরিয়ে দিয়ে পুনরুজ্জীবনের দিকে ধাবিত করেছে তার জীবনের গতিপথকে—

“বর্শা তোমার হয়ে গেল খান্‌ খান্‌

বুদ্ধি আমার অপাপবিদ্ধমস্নাবির।

জড় কবন্ধ অন্ধ কর্মে ফুৎকারের করি নর্মাচার।

প্রাক্তন-পাশ্চাত্ত্য মাগি না, মন তুষার।”

আসলে ট্রয়লাস জানে ‘সময়ের থলি শতছিদ্র বিস্মৃতি, কীট কাটে’—সঞ্চিত সব ঐশ্বর্য একদিন ঝরে যাবে, তখন মন শূন্য থলির মোহ ত্যাগ করতে চাইবে না। সব সাধনায় মত্ত হয়ে জীবনকে অস্বীকার করবে। কিন্তু যে শবসাধনা চায় না, চায় জীবনের আরাধনা—তাই সকল মোহকে উৎপাটিত করে সে আজ অপাপবিদ্ধ সখাবির বুদ্ধির অধিকারী। সে জানে যে সময় স্মৃতির ঐশ্বর্য ঝরিয়ে দেয়, তা যন্ত্রণাকেও একদিন মুছে ফেলে। তাই তার মন তুষারের মতো শুভ্র, সুন্দর ও নিষ্কলঙ্ক। অতীতের প্রতি কোন মোহ নেই, ঘৃণাও নেই। আছে আলোড়নহীন প্রশান্তি। যা ‘ক্রেসিডা’ কবিতার মর্মমূলে ধ্বনিত হয়েছে।।