কবিকঙ্কণ মুকুন্দের চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে কালকেতুর রাজ্যে বিভিন্ন জাতির আগমন ও সমাজবিন্যাস
ক্ষত্রিয়দের মধ্যে রাজপুত, মল্ল ও ভাটদের কথা পাওয়া যায়। তারমধ্যে ‘দোসর যমের দূত বৈশে যত রাজপুত’, ভাটরা ‘অবিরতপিঙ্গল পড়ে’ ইত্যাদি। বৈশ্যদের ও কালকেতুর রাজ্যে আগমন ঘটেছে— ‘বৈসে বৈশ্য মহাজন কৃষ্ণকথা অনুক্ষণ। কৃষিকর্ম করে গোরক্ষণ’ তার মধ্যে কিছু বৈশ্য আবার রত্নাদি কেনাকাটা করে ব্যবসা করে, কেউ আবার ব্যবসার জন্য বিদেশ যায় ইত্যাদি। বৈশ্যদের সম্বন্ধে তাই কবিকঙ্কণ জানিয়েছেন—‘এক বেচে আর কেনে নিতিনিতি বাড়ে ধনে/গুজরাটে বৈশ্য জন সুখী।’
বৈশ্যদের পর বৈদ্যদের স্বভাব ও তাদের সামাজিক অবস্থান কবিকঙ্কণ অঙ্কন করেছেন । সেন, গুপ্ত, দাস, দত্ত, কর প্রভৃতি বৈদ্যদের কথা এবং তারা যে বটিকা দিত রোগীকে, যোগ ব্যায়াম শেখাত এবং বিনিময়ে ‘নানা ছলে মাগয়ে বিদায়’। অগ্রদানী ব্রাহ্মণরা রাজ্যে রাজকর না দিয়ে যে শ্রাদ্ধাদি অনুষ্ঠানের পর গরু, সোনা, তিল, ধান প্রভৃতি দান গ্রহণ করত তার চিত্র পাওয়া যায়। অগ্রদানী ব্রাহ্মণরা বৈদ্যদের সঙ্গে থাকত এবং রোগীর খোঁজ নিত এই কারণে যে কেউ মরলে তার শ্রাদ্ধাদি অনুষ্ঠানে দান গ্রহণ করবে এই আশায় থাকত।
কায়স্থ জাতির বিভিন্ন পদবীধারীদের উল্লেখ করেছেন কবি। যেমন, ঘোষ, বসু, মিত্র, পাল, পালিত, নন্দী, সিংহ, সেন, দেব, দত্ত, দাস, সোম, চন্দ, ভঞ্জ, রাহা প্রভৃতি। এরা কালকেতুর কাছে ভাল বাড়ী, বলদ কেনার জন্য কড়ি ও সুবিচার কামনা করেছে।
এছাড়া গোপ ও ধীবর প্রভৃতি জাতিদের আগমনের মধ্যে সমাজের বিচিত্র পেশায় রত মানুষের বিচিত্র স্বভাব বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেছেন। যেমন, গোপরা কপটতা জানে না, কৃষিক্ষেত্রে তারা নানা ফসল উৎপাদন করে, তেলিরা কেউ চাষি, কেউ আবার তেল প্ৰস্তুত করে (ঘনা), কামার কৃষিকার্যের যন্ত্রপাতি তৈরী করে, কুম্ভকার হাঁড়ি কুঁড়ি তৈরী করে বারুইরা বরজ তৈরী করে ও কালকেতুকে নিত্য পান যোগায়, নাপিতরা রসাল দর্পণ হাতে রেখে ক্ষৌরকর্ম করে, সরাক জাতি যে অহিংস নিরামিষ ভোজন করে তারও উল্লেখ আছে। এভাবে বাইতি, বাগদি, সিউলি, পাটনি, গায়েন, কিরাত, শুঁড়ি, ডোম, চামার কোন জাতির প্রসঙ্গ যেন এড়িয়ে যাননি কবি মুকুন্দ। এমন কি কবি তাদের কথাও অনুক্ত রাখেননি :
‘লম্পট পুরুষ আশে বারবধূগণ বৈসে
একভিতে হইয়া অধিষ্ঠান ।’
সমগ্র সমাজটি যে কবির নখদর্পণে ছিল তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। কবিকঙ্কণ গোপ প্রভৃতি জাতির আগমনের মধ্যে যে সব শ্রেণীর উল্লেখ করেছেন তারাই ছিলেন সেকালের ব্যবসায়ী ও উৎপাদক শ্রেণী, অর্থাৎ অর্থ উৎপাদনের মূল উৎস। সেকালে শ্রমবিভাগ ছিল জন্মসূত্রে। একজন ইচ্ছা করলে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ করতে পারত না। পরস্পর পরস্পরের উপর নির্ভরশীল ছিল বলেই তৎকালীন সামাজিক বিন্যাসও ছিল চমকপ্রদ। ব্রাহ্মণদেরও বৈশ্য, নাপিত, কুমোর, চামার, কৃষককে প্রয়োজন হত। অর্থাৎ জন্মসূত্রে যে যার বৃত্তিগত কাজ করত। এর অশুভ দিকও ছিল। তা হল অস্পৃশ্যতা ও জাতিভেদ প্রথা ।
সুতরাং কালকেতুর গুজরাট নগর নির্মাণ ও প্রজাপত্তন অংশে কবি মুকুন্দ আদর্শ রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। যেখানে শোষণ, বঞ্চনা, অত্যাচার, বিদ্বেষ, উচ্চ-নীচ ভেদাভেদ, সাম্প্রদায়িক মনোভাব থাকবে না, থাকবে একই সমাজে বসে সকলের সমানাধিকার। চণ্ডীর আদেশের মধ্যেও সেই কথা—পুত্র সমান প্রজাকে পালন করা। কালকেতু সকলকে সম্মানিত করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার ব্রত গ্রহণ করেছিল। তাছাড়া বিভিন্ন জাতির আগমনে তৎকালীন সামাজিক বিন্যাস, তাদের নিত্যনৈমিত্তিক জীবন চর্যা, নগর পরিকল্পনার আধুনিকতা, সেই পরিকল্পনার মূলনীতি প্রভৃতির দিক থেকে কবি মুকুন্দের আলোচ্য প্রসঙ্গটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব তথা কাব্যমূল্য অসাধারণ।
