কবিকঙ্কণ মুকুন্দের চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে গুজরাট নগর নির্মাণ ও প্রজাপত্তন অংশে নগর পরিকল্পনা ও মধ্যযুগীয় সমাজ বন্যাস
একবিংশ শতাব্দীর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বিশ্বায়নের সুফল যখন আমরা পেতে চলেছি, আধুনিক নগরজীবনের সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য, সুযোগসুবিধা যখন আমরা পূর্ণমাত্রায় ভোগ করছি, তখন সেধরনের নগর পরিকল্পনা কবিকঙ্কণের কাব্যে খোঁজ করা বাতুলতা মাত্র। তবুও ষোড়শ শতকে বসে কবিকঙ্কণ গুজরাট নগরে কালকেতুর প্রজাপত্তন ও নগর নির্মাণ অংশে যে নগর পরিকল্পনা ও সমাজ বিন্যাসের খুঁটিনাটি পরিচয় দিয়েছেন তা তাঁর নিখুঁত সমাজাভিজ্ঞতা ও কল্পনা শক্তির নিদর্শন। আসলে ষোড়শ শতকে কবি নিজে যেভাবে অত্যাচারিত হয়েছেন এবং এই অত্যাচারের মূল যে সমাজে অসম বিন্যাস তথা অর্থনৈতিক বৈষম্য তা তিনি জানতেন বলেই এক আদর্শ নগর পরিকল্পনা করেছেন গুজরাট নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে—যেখানে শোষণ থাকবে না, থাকবে না ধনী নির্ধনের বৈষম্য। সবশ্রেণীর মানুষ একত্র সহাবস্থানের মাধ্যমে বসবাস করবে। অত্যাচারিত কবি নিজের মনে এক স্বপ্ন দেখেছিলেন এমন এক আদর্শ নগরের যা গুজরাট নগর পত্তন প্রসঙ্গে চিত্রিত হয়েছে। দেবী চণ্ডী নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে কালকেতুকে বলেছিলেন :
মাণিক অঙ্গুরী লহ সপ্ত রাজার ধন।
ভাঙ্গায়্যা বসাহ রাজ্য গুজরাট বন।।
বসাইতে জনে তুমি দিবে গরু ধান।
পালিবে সকল প্রজা পুত্রের সমান৷
তারপর ধনপ্রাপ্তি অংশে দেবী বলেছেন—(i) ‘নগরের মধ্যে দিবে আমার ভবন।’ (ii) ‘পূজিবে মঙ্গলবারে পাতাইবে জাত।’ (iii) ‘নিযুক্ত করিও তাহে উত্তম ব্রাহ্মণ’। সুতরাং প্রজাদের সুখ সুবিধার কথা ভেবে, পুত্রের মত তাদের লালন পালন করার নির্দেশ দিয়ে পূজা প্রচারের জন্য ব্রাহ্মণ নিয়োগ করে কালকেতুকে গুজরাট নগরের রাজা হবার কথা বলেছে চণ্ডী। এই সংবিধানের সূত্রের কথা মাথায় রেখে কালকেতু নগর নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রজাদের বসবাসের জন্য বেশ কিছু সুযোগ সুবিধা দিতে চেয়ে বুলান মণ্ডলের কাছে তার মনোভাব প্রকাশ করেছে। দেশের প্রধান বা রাজ্যের প্রধানরা মূলনীতিকে সামনে রেখে যেমন আর্থিক বাজেট পেশ করেন, কালকেতুও তেমনি চণ্ডীর নির্দেশকে সামনে রেখে, তার নীতিবোধ ও লক্ষ্যকে সকলের সামনে প্রকাশ করেছে—যা ‘বুলান মণ্ডলের প্রতি কালকেতু’ অংশে রূপায়িত করেছেন কবিকঙ্কণ।
আদর্শ নগর পরিকল্পনার গুণগুলি কালকেতু যেন বুলান মণ্ডলের কাছে প্রকাশ করেছে। যেমন
(ক) সকলের দুঃখ দুর্দশা দূর করা হবে।
(খ) যত ইচ্ছা চাষাবাদ করা যাবে এবং তার জন্য দেয় কর তিন বছর ধরে দেওয়া যাবে।
(গ) যে জমি চাষাবাদের জন্য থাকবে তার সীমানা নির্ধারিত করে দেওয়া হবে।
(ঘ) কর গ্রহণের ক্ষেত্রে কোন তাগাদা দেওয়া হবে না, এমনকি ডিহিদারও দেশে দেওয়া হবে না।
(ঙ) সেলামী, নজরানা, পার্বনী, পঞ্চক, গুড়ালোন, সানাভাত, বাঁশগাড়ী, ধানকাটা, কলম কসুর জাতীয় দণ্ড বিধানের নামে প্রজা শোষণ থাকবে না।
(চ) ব্যবসাবাণিজ্য যারা করবে তাদের কাছ থেকে কর নেওয়া হবে না। চাল-ধান বেচলে কোন কর নেওয়া হবে না।
(ছ) ব্রাহ্মণরা রাজ্যে বসবাস করলে তাদেরকে কর দিতে হবে না বরং তাঁদের জন্য বাসভূমি ও কৃষিজমি দান করা হবে।
(জ) সকলকে সম্মান জানানো হবে বা মর্যাদা দেওয়া হবে।
এই প্রতিশ্রুতিগুলি বর্তমানের কোন কোন নেতার ভোটের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি মাত্র নয়, কালকেতু পরবর্তী কালে এইসব সুযোগসুবিধাগুলি দিয়েছেন প্রজাদের, এমন কি দুষ্টের দমনও করেছেন, নগর বিন্যাসের মূলে যে মূল নীতি তা সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোকে কেন্দ্র করে গঠিত হলেও এই রাজ্য আদর্শ রাজ্য—সম্পূর্ণ শোষণ মুক্ত এক সমাজ। বলাবাহুল্য জমিদারের পীড়নে জর্জরিত কবি মুকুন্দের চোখের সামনে স্বভাবতই এক আদর্শ শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের স্বপ্ন উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। কালকেতু এখানে তাই কবিরই প্রতিনিধি।
‘গুজরাট নগর নির্মাণ’ অংশে কবি যে পরিচয় দিয়েছেন তা আদর্শ নগর পরিকল্পনার এই কারণে যে বর্তমানে আধুনিক জীবনে নগর পরিকল্পনার যে সব সুযোগসুবিধা দেখা যায় তার অনেকটাই গুজরাট নগর নির্মাণ অংশে পাওয়া যায় ৷
ব্রাহ্মণ্য সংস্কার অনুযায়ী গৃহ নির্মাণের আগে শুভ সময় দেখে, জ্যোতিষকে দিয়ে গণনা করে মাপজোখ করে যেমন উক্ত কাজ শুরু হয়, বর্তমানেও তেমনি ইঞ্জিনিয়ারকে দিয়ে বাড়ীর পরিকল্পনা করা হয়। কার্তিক মাসে, শুক্ল পক্ষে, ত্রয়োদশী তিথিতে, বৃহস্পতিবারে আয়ুষ্মান যোগে কালকেতুর প্রথম নগর নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। পুরীর মাঝামাঝি শান বাঁধানো সরোবর, তার একপাশে চণ্ডীমণ্ডপ, অন্যপাশে শিবমন্দির, বিষ্ণুর দেবালয় আর অন্নশালা, বামভাগে দুর্গামেলা, তার পাশে নাটশালা, পূর্বে জলাশয় ও প্রবেশের মুখে সিংহদ্বার, চারদিকে চতুঃশালা, তার চারদিকে প্রশস্ত দুয়ার, উত্তরভাগে খিড়কী দুয়ার, পুকুর। নগর চত্বরে অলোর মণ্ডপ ও ভাত শালা, অতিথিশালা ও মিলনগৃহ। হিন্দু-মুসলমান মৈত্রীর স্বপ্ন দেখেছিলেন কবি মুকুন্দ। তাই পশ্চিমে মুসলমানদের জন্য মসজিদও নির্মিত হল।
এই নগর পরিকল্পনা যেন আধুনিক জীবনের কল্পনাপ্রসূত। এর আগে কালকেতু বন কেটে যেভাবে নগরের পরিকল্পনা নিয়েছেন তাও কবিকঙ্কণের উচ্চ কল্পনাশক্তির নিদর্শন। বন কাটার কাজে বেরুনিয়াদের সাহায্য নিয়েছেন। অপ্রয়োজনীয় গাছ (খদির, গামারি, খিরিশ প্রভৃতি) কেটে ফেলেছেন, প্রয়োজনীয় গাছ যেগুলি জীবনের সঙ্গে যুক্ত সেগুলি (শর, নল, খাগড়া, বাঁশ, সেআকুল, উড়ম্বর, বাবলা, সিমুল, নিম, কেয়া প্রভৃতি) রেখেছেন। গাছ কেটে ফেলার জন্য কালকেতুকে পরিবেশ দূষণের দায়ে পড়তে হয়নি। কারণ তখনকার দিনে এত জনবসতি ছিল না, বনের ভাগ বরং বেশি ছিল, ছিল পরিবেশের ভারসাম্য। যে গাছগুলি কালকেতু রেখে দিয়েছিলেন তাতে কবি যে গাছ গাছালি সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞ ছিলেন তা বলাবাহুল্য। তখন তো বাজারে এত ঔষধ ছিল না। তাই গাছের শেকড়, পাতা-ই ঔষধের কাজ করত। সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় গাছগুলিকে রেখে দিয়েছিলেন।
গাছ কাটা হল, নগরের উপযোগী জায়গা হল, নগরও সুচারুরূপে নির্মিত হল, কিন্তু প্রজা কোথায়? যাদের জন্য এই কাজ তারাই যদি না আসে তাহলে তো সব উদ্দেশ্য নস্যাৎ হয়ে যায়, তাই কালকেতু দেবীর শরণাপন্ন হলেন এবং দেবীর সহায়তায় কলিঙ্গ দেশে প্লাবনের ফলে সেখান থেকে লোকজন গুজরাটে এল। কিন্তু লোকজনকে ঠিক ঠিক ভাবে বিন্যাস করা প্রয়োজন। শুরু হল প্রজাদের পুনর্বাসন ও পুনর্বিন্যাস। এই বিন্যাসের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হয়েছিল মধ্যযুগীয় সমাজ বিন্যাসের কথা। তার রাজ্য যতই আদর্শ হোক মধ্যযুগের জাতিভেদ প্রথা কালকেতু তথা তার সৃষ্টিকর্তাকে মানতে বাধ্য হতে হয়েছিল। কুলানুগামী শ্রমবিভাগ পদ্ধতি পুরোপুরি বর্তমান ছিল। মধ্যযুগীয় সামাজিক জীবনের ভিত্তি ছিল জন্মগত। জন্মসূত্রে বৃত্তি নির্ধারিত হত। তবে এই সমাজ ব্যবস্থা ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ, তা আধুনিক নগরবিন্যাসের জটিলতা থেকে মুক্ত।
