-->

বঙ্কিমচন্দ্রের ‘সাম্য’ প্রবন্ধ অবলম্বনে জনস্টুয়ার্ট মিল এবং তাঁর মতবাদ

বঙ্কিমচন্দ্রের ‘সাম্য’ প্রবন্ধ অবলম্বনে জনস্টুয়ার্ট মিল এবং তাঁর মতবাদ

বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন রাজনৈতিক চেতনাভ্রষ্ট জাতীয়তাবাদী লেখক। স্বদেশ প্রেমের আন্তরিক প্রেরণার বশেই তিনি বাংলাদেশের সমাজজীবন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে গভীরভাবে অবহিত হয়েছিলেন। তাঁর সমাজনীতি ও রাজনীতি বিষয়ক প্রবন্ধগুলির দ্বারাই বিশিষ্টভাবে রাষ্ট্রীয় চিন্তার পরিচয় প্রকাশিত হয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্রের এই রাজনৈতিক এক চেতনার প্রত্যক্ষ ফলশ্রুতি হোল সাম্য। এই প্রবন্ধটি তাঁর সমাজনীতি ও রাষ্ট্র বিষয়ক একটি উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ পুস্তিকা। যেখানে সমাজের প্রচলিত বর্ণবৈষম্য, অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষময় ফলের একটি সুস্পষ্ট ছবি বঙ্কিমচন্দ্রের প্রত্যক্ষগোচর হয়েছিল এবং প্রাসঙ্গিক ভাবে তিনি এই প্রবন্ধের যুক্তি বিচার সহ আলোচনা করে সামাজিক ভঙ্গুর অবস্থাগুলির প্রতি আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন।

বঙ্কিমচন্দ্রই বাংলাদেশে প্রথম সাহিত্যিক, রচনার মধ্য দিয়ে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের মূল মন্ত্র প্রচার করেছেন এবং তাঁর দ্বারাই সর্বপ্রথম বাংলাভাষায় কৃষিজীবী ও সাম্যবাদ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। সেই সময়কার ফরাসী দেশের রাষ্ট্রীয় মতাদর্শ থেকে বঙ্কিমচন্দ্র মূলত তাঁর সাম্যমন্ত্রের প্রেরণা লাভ করেছিলেন। ফরাসী বিপ্লবের পর থেকে ইউরোপে গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার সর্বত্র আদর্শ প্রচারিত হয়েছিল, বঙ্কিমচন্দ্র সেই আদর্শেই গভীর ভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার বাণী বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘সাম্য’ প্রবন্ধের মধ্য দিয়ে প্রচার করেছেন। আর তাঁর এই মতবাদ প্রত্যক্ষভাবে পাশ্চাত্য আদর্শেই পরিপুষ্ট সে কথাই প্রমাণিত হয়েছে।

জন স্টুয়ার্ট মিল এবং তাঁর মতবাদটি সম্পর্কে বঙ্কিমচন্দ্রের বিশেষ দুর্বলতা এই প্রবন্ধে অবশ্যই লক্ষণীয়। আসলে যে উপযোগিতা বাদের ভিত্তিতে বেন্থাম মানুষের নৈতিক লক্ষ্য অর্জন করাই জীবনের চরমতম কথা বলে মনে করতেন বঙ্কিমচন্দ্ৰ সেই বেন্থাম পদ্ধতিরই সারভূত রূপটি দেখতে পেয়েছিলেন মিলের মধ্যে। নৈতিকতার উন্নয়ন ও ব্যক্তির স্বাধীন বিকাশ জন স্টুয়ার্ট মিলের দুটি দিকই বঙ্কিমচন্দ্রকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছিল। কেননা স্টুয়ার্ট মিল যেমন ভাবতেন, প্রচলিত ব্যবস্থা ইত্যাদির সংশোধনের মধ্য দিয়েই মানবজাতির প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব, আমাদের বঙ্কিমচন্দ্র সেরকমই ভেবেছিলেন যে, গুরুতর সামাজিক, অর্থনৈতিক বৈষম্যের আধিক্যগুলি অপনদিত হতে পারে ব্যক্তির সদিচ্ছার ভেতর দিয়েই। প্রতিদিনে আত্মকর্ষণার ভেতরেই নৈতিকতার বোধ জাগ্রত হয়। বোধকরি সেজন্যই জন স্টুয়ার্ট মিলকে বঙ্কিমচন্দ্র নিজের মত করে বুঝে নিয়ে এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, ১) বৈষম্য থাকাই উচিত ২) সমাজে দ্বিধাবিভক্তি মঙ্গলকর। তবে একথা ঠিক যে যেন দুটি ক্ষেত্রে আধিক্য না ঘটে। তাঁর স্পষ্ট মত প্রচলিত ব্যবস্থার সংস্কারের ভিতর দিয়েই অতিরিক্ত বৈষম্যের ক্ষেত্রটিকে ক্রমশ সংকুচিত করাই কাঙ্ক্ষিত ।

বঙ্কিমচন্দ্র স্টুয়ার্ট মিলের দর্শনের মধ্যেই ‘সাম্যের মীমাংসা’ খুঁজে পেয়েছেন এবং এই স্টুয়ার্ট মিল শেষ পর্যন্ত তাঁর পথ নির্দেশক রূপে থেকে গেছেন। ‘সাম্য’ প্রবন্ধের উপসংহারে ‘জাতিগত বৈষম্যের’ উল্লেখ করেও যে আলোচনা থেকে তিনি নিরত থেকেছেন তার কারণ লুকিয়ে আছে এইখানে—কেননা আলোচনা শুরু হলেই ‘জেতা বিজেতা’ প্রসঙ্গ এসে যাবে, আসবে ইংরেজ শাসিত ভারতবর্ষের কথা ও মিলের প্রসঙ্গ, কারণ স্টুয়ার্ট মিলই তো সিপাহী বিদ্রোহ পরবর্তী ভারতে কোম্পানি শাসনের পক্ষে ছিল না, উপনিবেশগুলিতে পাকাপাকিভাবে শাসন অব্যাহত রাখার জন্য ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বিস্তর সওয়াল করেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র কোনভাবেই চাননি ব্রিটিশ ভারতের অবসান হোক বা কোনভাবে ব্রিটিশ শাসনের প্রতি ভারতীয়রা বিদ্বেষী হয়ে উঠুক। তবুও প্রশ্নটিকে আলোচনার স্তরে এনে ঘৃতাহুতি দিতে চাননি। আসলে ‘জেতা বিজেতা’ সম্পর্ক নিয়ে পর্যবেক্ষণ করলেই অনেক কঠিন সত্য বেরিয়ে আসবে যা এক অর্থে ইংরেজদের প্রতি বিরূপতাকেই জাগিয়ে তুলবে । সর্বোপরি তাঁর নিজের ভূমিকাকেও অনেক বেশি স্পষ্ট করে তুলতে হবে। সুতরাং ইংরেজ শাসনকে মেনে নিয়েও ভেতরে ভেতরে ক্ষতবিক্ষত হয়ে চলা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির পররাজ্য আগ্রাসনের প্রশ্নে বলেছিলেন “ইহাই এখানকার International Law’’। ‘যদি সত্য ও উন্নত হইতে চাও, তবে কাড়িয়া খাইবে।’ বোধকরি এ কারণেই সমালোচক ভবতোষ দত্ত বলেছেন-

“সাম্য-প্রবন্ধ আসলে পরের মতের বিশেষত মিলের মতের ব্যাখ্যা ছাড়া আর কি আছে ? আর যা আছে, তা তিনি ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ প্রবন্ধের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।”

তবে একথাও ঠিক যে, জন স্টুয়ার্ট মিলের প্রভাব বঙ্কিমচন্দ্রের জীবনের শেষের দিকে তেমন ছিল না। কারণ ব্যক্তিত্ববাদী বঙ্কিমচন্দ্র ব্যক্তির সম্যক অনুশীলনের ভিতর দিয়েই মনুষ্যত্বের শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছনো যাবে, – এই বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছিল বলে বাইরে থেকে আর সাম্য তত্ত্বে বিশ্বাস করেননি। একান্ত ভারতীয় হিসেবে গীতার মধ্যেই সেই কর্মযোগের সন্ধান পেয়েছেন।