বঙ্কিমচন্দ্রের ‘সাম্য’ প্রবন্ধ অবলম্বনে উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের বঙ্গদেশে কৃষকদের পরিস্থিতির পর্যালোচনা
ভারতবর্ষের সভ্যতা সৃষ্টির প্রথম যুগ থেকেই এখানকার শ্রমজীবী সম্প্রদায়ের ধারাবাহিক দুর্দশা চলছে। এদেশে কৃষকদের দুর্দশা দু-এক বছরে শুরু হয়নি। শ্রমজীবীর অধিকাংশই কৃষিজীবী। তাই কৃষিজীবীর দুর্দশার কথাই বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করা দরকার।
জমিদার ও রাজার দোষ আছে সত্য, কিন্তু প্রকৃতি গত কারণে অর্থাৎ প্রাকৃতিক নিয়মে তাদের দুর্দশা বহুদিন ধরে চলছে। বাংলাদেশের কৃষকদের অবস্থার অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমাদের চোখে পড়ে যে, সমগ্র ভারতবর্ষের অবস্থাও ভয়াবহ। এর ফলে বাংলাদেশে যা ঘটেছে, সমগ্র ভারতেও তা-ই ঘটেছে। শ্রমজীবী মাত্রই দুর্দশার ফল ভোগী ৷
জ্ঞানবৃদ্ধি সভ্যতার মূল । জ্ঞানের উন্নতি যে সভ্যতার কারণ সে কথা স্বীকার করা দরকার। জ্ঞানের উন্নতি না হলে সভ্যতার উন্নতি হতে পারে না। জ্ঞান অর্জন শ্রমসাধ্য। কিন্তু সবার আগে উদর পূরণ প্রয়োজন। অনাহারে কেউ জ্ঞানের চর্চা করতে পারে না। যদি সমাজের সকলে আহার অন্বেষণে ব্যস্ত থাকে তাহলে কাহারও জ্ঞান চর্চার অবকাশ হয় না। অতএব সভ্যতার শুরুতেই একটি সম্প্রদায় শারীরিক পরিশ্রম ব্যতীত আত্মা ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করে এবং তারাই জ্ঞানচর্চার দীপশিখাটি প্রজ্বলিত রাখে। শ্রমজীবীরা যদি কেবল নিজেদের ভরণ পোষণের জন্য খাদ্য উৎপাদন করে তাহলে সমাজে এই ব্যবস্থা কার্যকরী হয় না । যদি তারা অধিক উৎপাদন করে তবেই শ্রমবিরত ব্যক্তিরা প্রতিপালিত হয়ে বিদ্যালোচনা করে। উৎপাদকের উদ্বৃত্ত যা থাকে তাকেই সঞ্চয় বলে। অতএব সভ্যতার উদয়ের পূর্বে প্রথম আবশ্যক ধনসঞ্চয়। কি কি কারণে দেশ বিশেষে আদিম ধনসঞ্চয় হয় তার দুটি কারণ সংক্ষেপে নির্দেশ করা যেতে পারে। প্রথম কারণ ভূমির উর্বরতা দ্বিতীয় কারণ দেশের উষ্ণতা বা শীতলতা। শীতোষ্ণতার ফল দু প্রকার। শীতের দেশে অধিক খাদ্য প্রয়োজন; তাই ধনসঞ্চয় অপেক্ষাকৃত কম এবং উষ্ণ দেশে অল্প খাদ্যের প্রয়োজন। অতএব উষ্ণদেশে শীঘ্র সামাজিক ধনসঞ্চয় হয়। উষ্ণ দেশে খাদ্য অপেক্ষাকৃত সুলভ। খাদ্য সুলভ বলে সেখানে শীঘ্রই ধনসঞ্চয় হয়।
ভারতবর্ষ উষ্ণদেশ এবং সেখানে ভূমিও উর্বরা। সুতরাং ভারতে শীঘ্র ধনসঞ্চয় হওয়াই স্বাভাবিক। এইজন্য ভারতে অতি প্রাচীনকালে সভ্যতার উদয় হয়েছিল। কায়িক পরিশ্রম থেকে বিরত ভারতবর্ষের ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের অর্জিত ও প্রচারিত জ্ঞানের কারণেই ভারতবর্ষের সভ্যতা। এই প্রথম কালের সভ্যতাই ভারতীয় প্রজার দুরদৃষ্টের কারণ। কারণ জনসমাজ ধনসঞ্চয়ে দ্বিধাবিভক্ত হল । একভাগ শ্রম করে আর অন্যভাগ শ্রম করে না, যারা শ্রম করে না তাদের জ্ঞানবৃদ্ধির দ্বারা শ্রমজীবী উপকৃত হয় এবং তার পুরস্কারস্বরূপ শ্রমজীবীর অর্জিত ধনের অংশ তারা গ্রহণ করে এর দেশের উৎপন্ন ধন দুইভাগে বিভক্ত হয়। একভাগ শ্রমজীবীর এবং দ্বিতীয় ভাগ বুদ্ধিজীবীর, প্রথমটিকে বলা হয় বেতন এবং দ্বিতীয়টি মুনাফা। শ্রমজীবীর সংখ্যা অধিক। তথাপি বেতনেই তাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয় । মুনাফার কোনো অংশ তারা পায় না। এদিকে বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা কম। অথচ মুনাফায় তাদের অসপত্ন অধিকার।
অতএব দেখা যাচ্ছে লোকসংখ্যা বৃদ্ধি শ্রমজীবীর মহৎ অনিষ্টের কারণ। যে পরিমাণে লোকসংখ্যা বৃদ্ধি হয় সে পরিমাণে যদি দেশের উৎপাদন বৃদ্ধি পায় তবে শ্রমজীবীর অনিষ্ট হয় না। ইংলণ্ড ও আমেরিকায় লোকসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় ধনবৃদ্ধি অধিক হয়। তাই সে সব দেশের শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে। আর দেশের ধনবৃদ্ধি অপেক্ষা লোকসংখ্যার বৃদ্ধি যদি অধিক হয়, তবে শ্রমজীবীদের চরম দুর্দশা। ভারতবর্ষে এই ব্যাপারটি ঘটেছে। তাই শ্রমজীবীর এতদুর্দশা; কিন্তু লোকসংখ্যা বৃদ্ধি স্বাভাবিক নিয়ম। এটি মানুষের স্বভাবের নির্দেশ। এর সদুপায় হলো দেশের ধন বৃদ্ধি। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে যে পরিমাণে লোকসংখ্যা বৃদ্ধি হয়, সেই পরিমাণে ধনবৃদ্ধি হয়না। এই সমস্যার দুটি সমাধান। প্রথমত, দেশের কিছু লোক অন্য দেশে গিয়ে যদি বসবাস করে তাহলে দেশের উপর চাপ কমে। এই ভাবে ইংলণ্ডের লোক আমেরিকায় ও অস্ট্রেলিয়ায়; শুধু তাই নয়, সারা পৃথিবীতে তারা ছড়িয়ে পড়েছে। দ্বিতীয় উপায় বিবাহ প্রবৃত্তি দমন। কিন্তু ভারতবর্ষে এই দুটি উপায়ের একটি উপায়ও অবলম্বিত হতে পারেনি। দেশান্তরে গমন উদ্যোগ, উৎসাহ পরিশ্রমের কাজ । প্রকৃতি এ বিষয়ে প্রতিকূলতা করেছে। অলঙ্ঘ্য পর্বত ও সমুদ্র তাদের আবদ্ধ করে রেখেছে। বিবাহ প্রবৃত্তি দমনেও ভারতের উৎসাহ কম। এখানে জীবিকা অপেক্ষাকৃত সুলভ এবং আকাঙ্ক্ষাও কম। তাই বিবাহ প্রবৃত্তি দমন এখানে আর হল না, অপ্রতিহত গতিতে প্রজাবৃদ্ধি চলতে লাগল। কাজেই সভ্যতার প্রথম অভ্যুদয়ের পরেই ভারতের শ্রমজীবীর দুর্দশা আরম্ভ হল। যে ভূমির উর্বরতা ও বায়ুর উষ্ণতা হেতু সভ্যতার উদয়, তাতেই জনসাধারণের দুরবস্থার কারণ সৃষ্টি হল। উভয়ই অলঙ্ঘ্য নৈসর্গিক নিয়মের ফল।
শ্রমজীবীর দুর্দশার এখানে আরম্ভ । কিন্তু একবার অবনতি আরম্ভ হলে ক্রমে তার আরও অবনতি ঘটে। যে পরিমাণে শ্রমজীবীদের দুর্দশা বৃদ্ধি হতে লাগলো, সেই পরিমাণে তাদের সঙ্গে সমাজের অন্যান্য সম্প্রদায়ের তারতম্য সূচিত হল। প্রথম ধনের তারতম্যতার ফলে অধিকারের তারতম্য দেখা গেল। বুদ্ধিজীবীদের প্রভুত্বের ফল অত্যাচার, এই প্রভুত্বেই শূদ্রপীড়ক স্মৃতিশাস্ত্রের মূল প্রোথিত হল।
নিম্নবর্ণের প্রতি সমাজের উচ্চবর্ণের বা সম্প্রদায়ের এই প্রভেদ দেশের সার্বিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করেছে। কারণ শোষণ বঞ্চনা অত্যাচার ও পীড়ন ভারতীয় শ্রমজীবী ও প্রজাদের অদৃষ্টলিপি । সমাজের মুষ্টিমেয় একশ্রেণীর প্রাধান্য যে দেশের ধারাবাহিক ও সার্বিক উন্নতি করতে পারেনা, একথা বঙ্কিমচন্দ্র স্থির আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে নিবেদন করেছেন ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায়। বর্ণভেদের আধিক্য স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ স্বীকার করেছেন।
জাতের নামে বজ্জাতি ভারতবর্ষের সমাজব্যবস্থার প্রত্যক্ষ কুফল। তথাকথিত উচ্চবর্ণরা ভেবেছিলাম তাদের উন্নতি হলেই ভারতবর্ষের উন্নতি হবে। কিন্তু একথা দিবালোকের মতো সত্য যে দেশের নিরানব্বই শতাংশ লোককে অজ্ঞানতার অন্ধকারে রেখে এবং তাদের উপর দমন পীড়ন চালিয়ে গেলে দেশের সামগ্রিক উন্নতি হওয়া সম্ভব নয় । বিশ্বের সকল উন্নতদেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে একেবারে মূল স্তর থেকে মানব সমাজের সামগ্রিক মঙ্গল হলে তবেই দেশের প্রকৃত মঙ্গল। দেশের সমগ্র মানুষকে বঞ্চিত করে সমাজের উচ্চশ্রেণীর মানুষের যথার্থ মঙ্গল সাধিত হতে পারেনা। কারণ সমগ্র মানুষকে নিয়েই দেশ। বিশেষ গোষ্ঠী নিয়ে দেশ গঠিত হয়। পাশ্চাত্যে যে সব দেশ উন্নতি করেছে সেই সব জাতি সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে জীবনের মূল স্রোতে নিয়ে এসেছে। অচ্ছুত ও অপাঙ্তেয় করে রাখেনি। যে অপমান এতদিন ধরে কৃষিজীবী মানুষের কপালে জুটেছে সেই অপমান দ্বিগুণ হয়ে ফিরে এসেছে। কারণ –
এ আমার এ তোমার পাপ।
বিধাতার বক্ষে সেই তাপ ৷৷
তাই নূতন ঊষার স্বর্ণদ্বার পানেই যদি আমাদের যাত্রা করতে হয় তাহলে বাধা বিপত্তির ঝড়ঝঞ্ঝা অস্বীকার করে সমস্ত পিছুটান উপেক্ষা করে নবীন কালের মাঝে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে কৃষিসমাজকে তথা শ্রমজীবীদের । তবেই ভারতের ভাগ্যে নব সূর্যের উদয় হবে । শূদ্র নামক অসংখ্য জনতাকে কর্মোদ্যোগের সাথী করে নিতে হবে এবং ‘ভাগ করে খেতে হবে সকলের সাথে অন্নপান’ । তবেই সার্থক হবে আমাদের জীবন যাত্রা।
