-->

নাট্যকার ভবভূতি

নাট্যকার ভবভূতি
ভবভূতি:

সংস্কৃত নাট্যসাহিত্যে কবি কালিদাসের পরেই “শ্রীকণ্ঠ-পদ-লাঞ্ছন’ ভবভূতির স্থান, দেহরূপের অন্তরালে মানুষের মনোরাজ্যে শোক ও দুঃখের যে প্রচ্ছন্ন অবস্থা, তাকে অনুভূতির উষ্ণতায় দ্রবীভূত করে নাট্যধারায় উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে ভবভূতি অদ্বিতীয়।

ভবভূতি তিনখানি নাটক রচনা করেন – (১) মহাবীরচরিত (বীররস যুক্ত রামকথাশ্রিত সাত অঙ্কের নাটক)। (২) মালতীমাধব (শৃঙ্গাররস যুক্ত বৃহৎকথাশ্রিত দশাঙ্কের প্রকরণ)। (৩) উত্তররামচরিত (করুণরস যুক্ত রামকথাশ্রিত সাত অঙ্কের নাটক)।

মহাবীরচরিত:

সাত অঙ্কে সম্পূর্ণ এই নাটকে শ্রীরামের জীবনের বীরত্বপূর্ণ কীর্তিগুলি গ্রথিত হয়েছে। এটি বীররস প্রধান সাত অঙ্কের নাটক। এই নাটকে রামের ‘সিদ্ধাশ্রম’-এ প্রবেশ থেকে রাবণ বাধের পর অযোধ্যায় ফিরে আসা পর্যন্ত ঘটনাবলি বর্ণিত হয়েছে। এই নাটক ভবভূতির প্রথম রচনা হলেও, তার কল্পনাশক্তি, সূক্ষ্ম আবেগ ও অনুভূতিকে ভাষায় রূপায়িত করার ক্ষমতাকে নিঃসন্দেহে তুলে ধরেছে।

মালতীমাধব:

মহাকবি কালিদাসের পরেই সংস্কৃত নাট্যসাহিত্যে একটি স্মরণীয় নাম ভবভূতি। শূদ্রকের মৃচ্ছকটিকের মতোই মালতীমাধব দশাঙ্ক বিশিষ্ট প্রকরণ। এই নাটকের বীজ গুণাঢ্যের বৃহৎকথা, কথাসরিৎসাগর (৩/৪, ৩/৪/১৪৫-১৪৭, ১৩/১), বৃহকথামঞ্জরী (৩, ১১), কালিদাসের বিক্রমোর্বশীয় নাটকের চতুর্থ অঙ্ক প্রভৃতি। এই নাটকের নায়ক অমাত্য দেবরাতের পুত্র মাধব এবং নায়িকা ভূরিবসুর কন্যা মালতী। নায়িকা ও নায়কের নাম অনুসারে নাটকের নামকরণ হয়েছে মালতীমাধব।

মালতীমাধব নাটকের বৈশিষ্ট্যগুলি হল –  সংস্কৃত নাট্যশাস্ত্র অনুসারে মালতীমাধব একটি প্রকরণ। এতে সাধারণ মানুষের জীবন থেকে বা নাট্যকারের কল্পনা থেকে বিষয়বস্তু উৎসারিত হয়েছে। এখানে শৃঙ্গার রসের প্রাধান্য, দশ অঙ্ক আছে। নায়িকা এখানে উচ্চবংশজাতা, যেমন - মালতী। বাস্তবতা এবং সামাজিক জীবনের পটভূমিতে রচিত হয়েছে। প্রেমের উপাদান থাকায় এখানে নাট্যকারের কল্পনাশক্তি ও কাব্যক্ষমতা প্রকাশের পেয়েছে। এই নাটক থেকে নাট্যশিল্প সম্পর্কে ভবভূতির নিজস্ব কয়েকটি মতের পরিচয়ও পাওয়া যায়। যেমন - রসাদির প্রচুর নিগৃঢ় প্রয়োগ, মনোরঞ্জক অভিনয় ক্রিয়া, বীরত্বযুক্ত প্রণয়, বৈদগ্ধ্যপূর্ণ সংলাপ। এই নাটকে ভবভূতি বিচিত্র রস পরিবেশন করেছেন। এতে শৃঙ্গার রসের প্রাধান্য থাকলেও করুণ, অদ্ভুত, রৌদ্র, ভয়ংকর ও বীভৎস রসের সমাবেশ ঘটানোয় নাট্যকারের দক্ষতা প্রকাশ পেয়েছে। নাটকটির এক স্থানে শ্মশান ও তান্ত্রিক আচার অনুশীলনের চিত্র বর্ণনায় বীভৎস রসের অবতারণা করেছেন নাট্যকার। নাট্যকার ভবভূতি ঘটনা ও চরিত্রের বহুমুখীনতার সঙ্গে রসবৈচিত্র্যেরও সৃষ্টি করেছেন। সাথে সাথে নাট্যকার প্রেমের নানা অবস্থাকে ফুটিয়ে তুলেছেন এই নাটকে।

উত্তররামচরিত:

মহাকবি কালিদাসের পরে সংস্কৃত নাট্যসাহিত্যে যাঁর নাম অবিস্মরণীয় হয়ে আছে সেই শ্রীকণ্ঠ ভবভূতির শ্রেষ্ঠ নাটক উত্তররামচরিত। “উত্তররামচরিতে ভবভূতির্বিশিষ্যতে।” মহাবীরচরিত নাটকের পরিপূরক জাতীয় বীর রামচন্দ্রের উত্তরজীবন অবলম্বনে করুণরসের সাত অঙ্ক অবলম্বনে উত্তররামচরিত রচনা করেন। রামায়ণের উত্তরকাণ্ড অবলম্বনে এই নাটক ভবভূতি রচনা করেন। পদ্মপুরাণের পাতালখণ্ডের (১-৬৮) প্রভাবও লক্ষ করা যায়। রামচন্দ্রের উত্তর জীবনের কাহিনি নিয়ে নাটকটি লেখা হয়েছে বলেই নাম দিয়েছেন উত্তররামচরিত।

উত্তররামচরিত নাটকের বৈশিষ্ট্যগুলি হল – এই নাটকে কবির মানসিক উৎকর্ষ, নাট্যকুশলতা, মানবচরিত্রে অভিজ্ঞতা ও জীবনের মূল্যবোধগুলি পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে। ভবভূতির প্রেম স্পর্শকাতর, স্পর্শে অভিভূত এবং সঞ্জীবিত। বাৎসল্য, বন্ধুপ্রীতি, প্রেম সর্বত্রই এই এক রসের প্রকারভেদ। তিনি বিরহেও প্রেমের সৌন্দর্য অবিষ্কার করেছেন। চরিত্রচিত্রণে ভবভূতি যথেষ্ট সার্থকতা দেখিয়েছেন – রাম ও সীতার চরিত্র মহিমোজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। রাম তার প্রভানুরঞ্জন ব্রতে অটল থেকে মহৎশক্তি ও অশেষ দুঃখ সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, সীতা তার পবিত্রতা, কোমলতা ও পাতিব্রত্যের শক্তিতে প্রায় ঐশ্বরীয় মূর্তি লাভ করেছেন।

ভবভূতির রচনায় নাটকীয় ঘটনা-সংস্থান ও কাব্যসুষমা দুটি গুণেরই সুন্দর সমন্বয় ঘটেছে। চিত্ৰদৰ্শন দৃশ্যে যে প্রতিক্রিয়া হয়, তার মধ্যে মিশে আছে একাধারে বিয়োগান্তক পরিণতিজনিত বিষাদ ও অপরিমেয় ভালোবাসা। তৃতীয় অঙ্কে রাম ও ছায়া সীতার দৃশ্যের আবেদন অতুলনীয়। একদিকে রামের অসহায়তা, অন্যদিকে বাসন্তীর ক্রোধ ও যন্ত্রণা, এগুলির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সীতার অনুভূতির বৈচিত্র্য। ভবভূতির আর-একটি গুণ প্রাকৃতিক দৃশ্যের অপরূপ বর্ণনা। যেমন – পঞ্চবটীর অরণ্যশ্রী, জনস্থানের গিরিনদীর বর্ণনা, বনদেবী বাসন্তী, মূরলা, তমসা, ভাগীরথী প্রভৃতি। বিভিন্ন রসের উদ্ভাবনে যেমন – বীর, করুণ, রৌদ্র, অদ্ভুত ভয়ানক এবং শৃঙ্গার ভবভূতির ক্ষমতা অপরিসীম। করুণ রস সৃষ্টিতে ভবভূতি অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাই বলা হয় – “কারুণ্যং ভবভূতিরেব তনুতে।” উত্তররামচরিতে করুণ রসের অপূর্ব বর্ণনায় “অপি গ্রাবা রোদিত্যপি দলতি বজ্ৰস্য হৃদয়ম্‌” (১/২৮)। পাষাণও কেঁদে ওঠে, বজ্রও বিগলিত হয়। করুণ রসেরই সকল রসের যে পর্যবসান তা কবি নিজেই বলেছেন –

“একো রসঃ করুণ এব নিমিত্তভেদাদ্‌
ভিন্নঃ পৃথক্‌ পৃথগিবাশ্রয়তে বিবর্তান্‌।” (৩/৪৭)

ভবভূতি শিল্পভাবনা, মানবিক অনুভূতির প্রকাশ, কল্পনাশক্তির ব্যাপকতা ও রামকাহিনির গভীর ব্যঞ্জনা নাটকীয় বিচ্যুতির ব্যাপারগুলিকে ঢেকে দিয়েছে। তাই নাটকগুলি সংস্কৃত সাহিত্যের ভাণ্ডারে উজ্জ্বল রত্নরূপে পরিগণিত হয়েছে।