প্রাচীন সাহিত্য || মেঘদূত -- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
“মেঘদূত' প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বিরহী যক্ষের জবানীতে মানব-মনের একটি শাশ্বত সত্যকে ভাষা দিয়েছেন।”
কালিদাসের ‘মেঘদূত' কাব্য রবীন্দ্রনাথের আবাল্যপ্রিয় গ্রন্থ। তিনি নানা সময়ে এই গ্রন্থ পাঠ করেছেন; এবং এর অর্থ প্রতিবারই গভীর থেকে গভীরতর ব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধ হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের চোখে ‘মেঘদূত' কাব্যের বিরহী যক্ষ নিখিল-মানবমনের বিরহ ব্যাকুলতার প্রতীক। এ বিরহ কেবল অতীতের সঙ্গে বর্তমানের নয়, এ বিরহ এক মানুষ থেকে অন্য মানুষের বিরহ। প্রতিটি মানুষ আজ স্বতন্ত্র ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, অথচ একদিন তারা এক ছিল। আজ সে মিলনের জন্য উৎকণ্ঠিত, কিন্তু মাঝখানে দুস্তর সমুদ্র।‘মেঘদূত' কাব্যের বিরহী যক্ষ রবীন্দ্রনাথের কাছে এই বিরহ-ব্যাকুলতার প্রতীক।
বিরহী যক্ষ মেঘকে দূর করে তার অলকাপুরীর অধিবাসিনী প্রবাসিনী প্রিয়ার কাছে বার্তা প্রেরণ করেছিল। সেই মেঘ নদ-নদী-নগরীর ওপর দিয়ে বিরহী যক্ষের হৃদয়-বেদনার বার্তা নিয়ে উড়ে চলেছিল। এই মেঘ অনন্তকাল ধরে চলছে, চলছে নিখিল মানবমনের বিরহ ব্যাকুলতার বার্তাবহ হয়ে।
যক্ষ তার প্রিয়ার সঙ্গে মিলিত হতে চেয়েছিল। তার এই বিচ্ছিন্ন জীবন তার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। অথচ এককালে তারা এক ছিল, সম্মিলিত জীবন যাপন করেছিল। আজ কার অভিশাপে উভয়ের মধ্যে দুস্তর ব্যবধান?
যক্ষের এই বিরহ যেন নিখিল মানবমনের আপন সত্তার মধ্যে বিচ্ছিন্নতা দ্যোতিত করছে। “আমরা প্রত্যেক নির্জন গিরিশৃঙ্গে একাকী দণ্ডায়মান হইয়া উত্তরমুখে চাহিয়া আছি-মাঝখানে আকাশ এবং মেঘ এবং সুন্দরী পৃথিবীর রেবা শিপ্রা অবন্তী উজ্জয়িনী, সুখ-সৌন্দর্য-ভোগ-ঐশ্বর্যের চিত্রলেখা; যাহাতে মনে করাইয়া দেয়, কাছে আসিতে দেয় না; আকাঙ্ক্ষার উদ্রেক করে, নিবৃত্তি করে না। দুটি মানুষের মধ্যে এতটা দুর!” - মানুষ প্রত্যেকে যেন এক একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ; পরস্পরের মধ্যে অপরিমেয় অশ্রুলবণাক্ত সমুদ্র, দূর থেকে পরস্পরের দিকে চেয়ে মনে হয় আমরা যেন কোনো কালে এক ছিলাম; আজ কোনো অনির্দেশ্য শক্তির অভিশাপে আমাদের মধ্যে এই বিচ্ছেদ এসেছে। আমাদের এই ক্ষুদ্র বর্তমান সেই স্বর্ণময় অতীতের সঙ্গে সম্পর্ক হারিয়ে ফেলেছে। অথচ আমাদের মধ্যে মনুষ্যত্বের নিবিড় ঐক্য আছে, একমাত্র ব্যবধান হল মহাকাল। সেই অতীত কালিদাসের কাব্যের মধ্য দিয়ে আমাদের কাছে এক সৌন্দর্যের অলকাপুরীতে পরিণত হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ শুধু বর্তমানের সঙ্গে অতীতের সম্পর্কচ্ছেদের ওপর দৃষ্টিপাত করেননি; তিনি বলছেন, আজ মানুষের সঙ্গে মানুষের বিচ্ছিন্নতা ঘটে গেছে। “প্রত্যেক মানুষের মধ্যে অতলস্পর্শ বিরহ। আমরা যাহার সহিত মিলিত হইতে চাহি সে আপনার মানসসরোবরের অগম্য তীরে বাস করিতেছে; সেখানে কেবল কল্পনাকে পাঠানো যায়, সেখানে সশরীরে উপনীত হইবার কোনো পথ নাই।...অনন্তের কেন্দ্রবর্তী সেই প্রিয়তম অবিনশ্বর মানুষটির সাক্ষাৎ কে লাভ করিবে।”
রবীন্দ্রনাথ মানুষের এই বিচ্ছিন্নতার সংবাদ শুধু কালিদাস থেকে আহরণ করেননি; বৈষ্ণব পদকর্তাদের পদাবলিতেও তিনি একই বার্তা আহরণ করেছেন। বৈষ্ণব কাব্যের বিরহ-ভাবনা কালিদাসের যক্ষের বিরহ-ভাবনাকে সমৃদ্ধ করেছে।
রবীন্দ্রনাথ অতীত ও বর্তমান, প্রেয় ও শ্রেয়র মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করেছেন, সে পার্থক্য হয়তো প্রকৃতপক্ষে সত্য ও কল্পনার পার্থক্য—Ideal আর Reality-র পার্থক্য। এই কথাই তিনি অন্যত্র বলেছেন, “কালিদাসের কাব্যে বাহিরের সঙ্গে ভিতরের, অবস্থার সঙ্গে আকাঙ্ক্ষার একটা দ্বন্দ্ব আছে। ভারতবর্ষে যে তপস্যার যুগ তখন অতীত হয়ে গিয়েছিল, ঐশ্বর্যশালী রাজসিংহানের পাশে বসে কবি সেই নির্মল সুদূর কালের দিকে একটা বেদনা বহন করে তাকিয়েছিলেন।”
রবীন্দ্রনাথ আদর্শ ও বাস্তবের মধ্যে একটা বিরোধ দেখিয়েছেন, সত্য ও কল্পনার মধ্যেও দেখিয়েছেন একটা দ্বন্দ্ব। কিন্তু ‘কুমারসম্ভব' প্রবন্ধে এসে তিনি এই দ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়েছেন। কালিদাসের অধিকাংশ কাব্যের মধ্যেই এই দ্বন্দ্বটি সুস্পষ্ট দেখা যায়। এই দ্বন্দ্বের সমাধান কোথায়, ‘কুমারসম্ভব'-এ তাই দেখানো হয়েছে। কবি এই কাব্যে বলেছেন, ত্যাগের সঙ্গে ঐশ্বর্যের, তপস্যার সঙ্গে প্রেমের সম্মিলনেই শৌর্যের উদ্ভব; সেই শৌর্যেই মানুষ সকল প্রকার পরাভব হতে উবার পায়। অর্থাৎ ত্যাগের ও ভোগের সামঞ্জস্যেই পূর্ণ শক্তি। ত্যাগী শিব যখন একাকী সমাধিমগ্ন তখনো স্বর্গরাজ্য অসহায়, আবার সতী যখন পিতৃ ভবনের ঐশ্বর্যে একাকিনী আবদ্ধ তখনো দৈত্যের উপদ্রব প্রবল।
প্রবৃত্তি প্রবল হয়ে উঠলেই ত্যাগ ও ভোগের সামঞ্জস্য ভেঙে যায়। 'মেঘদূত’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ এতদূর অগ্রসর হতে পারেননি। তাই মেঘদূত প্রবন্ধটিতে রবীন্দ্রনাথ একটি শাশ্বত সতের একাংশ আলোকিত করেছেন।
