শব্দার্থ পরিবর্তনের ধারা
শব্দার্থ পরিবর্তন:
কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভাষার কাঠামোও পরিবর্তিত হয়। তেমনি তার ভিতরের অর্থেরও পরিবর্তন হয়। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে তত বেশি পরিবর্তনের ধারার রূপ লক্ষ্য করা যায় না। সাধারণত: শব্দার্থ পরিবর্তনের ধারায় শব্দকে মূলত তিনভাগে ভাগ করা যায় –
ক) অর্থের বিস্তার বা অর্থ প্রসার
খ) অর্থ সংকোচ
গ) অর্থ সংক্রামণ বা অর্থ সংশ্লেষ
ক) অর্থের বিস্তার বা প্রসার:
যদি কোন শব্দ প্রথমে কোন সংকীর্ণ ভাব বা সীমাবদ্ধ বস্তুকে বোঝায় এবং কিছুকাল পরে ব্যাপক ভাব বা অধিকতর বস্তুকে বোঝায় তবে সেই প্রক্রিয়াকে অর্থ বিস্তার বলে।
সাধারণত: রূপক বা অতিশয়োক্তির জন্য এরকম অর্থ বিস্তার ঘটে থাকে। যেমন – পূর্বে সংস্কৃতে বর্ষ শব্দের অর্থ ছিল বর্ষাকাল। অর্থাৎ বৎসরের একটি মাত্র অংশ। পরে শব্দটি একটিমাত্র অর্থে প্রকাশিত না হয়ে এই বর্ষ শব্দটি একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থাৎ সারা বছরের সম্পূর্ণ অর্থ প্রকাশ করে। এভাবে বর্ষ শব্দের অর্থ বিস্তার ঘটেছে। এছাড়াও আরও অনেক ধরণের শব্দ বিস্তার হয়ে থাকে। পরশু, মীরজাফর, কালি ইত্যাদি।
খ) অর্থ সংকোচ:
যদি কোন শব্দ প্রথমে কোন একাধিক বস্তুকে ব্যাপক ভাবকে না বুঝিয়ে একটি মাত্র ভাব বা বস্তুকে বোঝায় তবে সেই প্রক্রিয়াকে বলে অর্থ সংকোচন।
যেমন – পূর্বে সংস্কৃতে প্রদীপের অর্থ ছিল সবরকমের আলো পরে বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায় একটি বিশেষ রকমের আলো যা পিতল বা মাটির তৈরি এবং যাতে তেল ও সলতের সংযোগে আলো দান করে। অতএব এখানে প্রদীপ শব্দের অর্থ সংকোচন হয়েছে।
গ) শব্দের সংশ্লেষ:
শব্দের অর্থ পরিবর্তন কতগুলি ধাপের মধ্য দিয়ে হয়ে অনেক সময় শব্দের অর্থ পরিবর্তিত হতে হতে শেষ ধাপে এসে শব্দের এমন নতুন অর্থ দাড়ায় যা মূল অর্থের সঙ্গে সংযোগ থাকে না তখন মনে হয় শব্দটির অর্থ এক বস্তু থেকে একেবারে অন্য বস্তুতে সরে এসেছে এ ধরণের অর্থ পরিবর্তনকে অর্থ সংশ্লেষ বলে। যেমন : পাত্র শব্দের অর্থ ছিল যেকোনো রকমের আধার এবং সংকীর্ণ অর্থ হল কন্যা দান করার আধার এরপর একেবারে সংকীর্ণ অর্থ এসে দাঁড়ায় বর। অতএব দেখাই যাচ্ছে মূল শব্দের সঙ্গে এই শব্দের কোন যোগ নেই।
বিভিন্ন ভাষা সাহিত্যিকরা অর্থ সংক্রমণকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন
১) অর্থ উন্নতি বা শব্দের উৎকর্ষ
২) শব্দের অবনতি বা অপকর্ষ
১) অর্থ উন্নতি:
কোন শব্দের অর্থ যদি এমন ভাবে পরিবর্তিত হয়, শব্দটি পূর্বে যে ভাব বা বস্তুকে নির্দেশ করত তার চেয়ে যদি সম্মানিত বা অপেক্ষাকৃত উন্নত ভাব বা বস্তুকে নির্দেশ করে তাকে অর্থ উন্নতি বলে।
যেমন: অপরূপ শব্দের অর্থ ছিল কদাকার, পরে এর অর্থ দাঁড়ায় অতি সুন্দর।
২) শব্দের অবনতি:
কোন শব্দের অর্থ পরিবর্তন যদি এমনভাবে হয় যে, শব্দটি পূর্বাপেক্ষায় হেয় বা তুচ্ছ বিষয়কে বোঝায় তবেই সেই প্রক্রিয়াকে বলে শব্দের অবনতি।
যেমন: শকুন শব্দের অর্থ ছিল পাখি। কিন্তু বর্তমানে দাঁড়ায় কুখাদ্য দ্রব্য লোভী পাখি।
বলা বাহুল্য উপযুক্ত আলোচনা করার পর আমরা সমবেত ভাবে বলতে পারি যে শব্দার্থ পরিবর্তনের ধারায় ইতিহাসের মধ্যে জাতির সামাজিক ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এভাবে শব্দার্থ পরিবর্তনের ধারা বাংলা ভাষা সাহিত্যের ইতিহাসে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়।

