কালকেতুর ভোজন : কৌতুকরস এবং দাম্পত্য জীবনের স্বরূপ
কবি কঙ্কণের ‘অভয়ামঙ্গল’-এর নায়ক কালকেতু। তাই তার আহার, বিহার, মৃগয়া সব কিছুই নায়কোচিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। সে কারণে কবি কঙ্কণ মাঝে মাঝে অতিরঞ্জনের আশ্রয় নিলেও সেই বাহুল্য বর্ণনা নৈপুণ্যে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ‘কালকেতুর ভোজন’ শীর্ষক অংশে কবি কঙ্কণ যে কৌতুকরসের পরিচয় দিয়েছেন, তাতে তার জীবন রসিকতার পরিচয় স্পষ্ট। তাছাড়া মঙ্গলকাব্য তৎকালীন দিনে গান করা হত। তাই শ্রোতাদের মনোরঞ্জনের কথা কবিকে মনে রাখতে হত। ‘কালকেতুর ভোজন’ অংশটিও শ্রোতাদের মনোরঞ্জনের দিকে লক্ষ্য রেখে রচনা করতে পারেন। তবে এই অংশে বর্ণনার বলিষ্ঠতায় ও সাবলীলতায় অতিরঞ্জন অনেকখানি ঢাকা পড়ে যায়।
বিবাহোত্তর জীবনে কালকেতু ও ফুল্লরার ঘরকন্না বোঝাপড়ার মধ্য দিয়েই অতিবাহিত হচ্ছিল। কালকেতু মৃগয়া করে আর ফুল্লরা সেই মাংস, পশুর বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বেচে জীবিকানির্বাহের অর্থ সংগ্রহ করে। একদিন মৃগয়া থেকে ফিরে আসার পর কালকেতু কিভাবে ভোজন করেছিল তা জীবনরসিক কবি মুকুন্দ অদ্ভুতভাবে বর্ণনা করেছেন—যার মধ্যে কৌতুক রস যথেষ্ট পরিমাণে আমদানি করতে পেরেছেন।
ফুল্লরা সাধারণ বধূ। পতির প্রতি তার নিষ্ঠা ও শ্রদ্ধা যথেষ্ট। তাই দূর থেকে ফুল্লরা বীরের সাড়া পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্ভ্রমের সঙ্গে হরিণের ছালের আসনে উপবেশন করতে দিল। ফুল্লরা জানে তার স্বামী মৃগয়া করে অনেকক্ষণ তৃষ্ণার্ত রয়েছে, তাই বোঁচা নারকেলের জল পুরে খেতে দিয়ে আহারের জায়গা প্রস্তুত করতে গেল। সেই সুযোগে কালকেতুও পা-হাত ধুয়ে, মুখে জল দিয়ে মনের স্ফূর্তিতে আহারের জন্য উপবেশন করল। কবি মুকুন্দের দৃষ্টি কত তীক্ষ্ণ তা উপলব্ধি করতে অসুবিধা হয় না। তা না হলে আহারে উপবেশনের সময়ে কালকেতুর মনের কৌতুককেও লিপিবদ্ধ করতে ভোলেন নি। কবি দাম্পত্য জীবনের পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সুখের ছবিটিকে উপহার দিয়েছেন।
আহার পরিবেশনের সময় নারীর সম্ভ্রমকেও পর্যন্ত কবি কঙ্কণ তার বর্ণনার অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তাই—সম্ভ্রমে ফুল্লরা পাতে মাটিয়া পাথরা।/বেঞ্জন খাইতে দিল নূতন খাপরা’। এরপরের বর্ণনায় কৌতুকের পরিবেশন। তা না হলে খাওয়ার আগে কালকেতুর গোঁফ দুটো মুচড়ে ঘাড়ে বাঁধার বর্ণনা দেবেন কেন? শুধু কি তাই, কালকেতুর ভোজনতালিকা বৃহৎ ও বৈচিত্র্যময়, আর এই বর্ণনা যেমন প্রাণবস্তু তেমনি কৌতুকে ভরা। কালকেতুর ভোজনের তালিকা এই রকম— একশ্বাসে সাত হাঁড়ি আমানি পান, চার হাঁড়ি ক্ষুদের জাউ, লাউ সমেত ছয় হাঁড়ি মুসুরির সুপ, দুতিন ঝুড়ি আলু—ওন পোড়া, কচুর সঙ্গে কিছু করঞ্জা আমড়া।
এর পরবর্তী বর্ণনা কবি মুকুন্দের জীবন রসিকতার পরিচয়। যেমন—
“অম্বল খাইয়া বীর বনিতারে পুছে।
রন্ধন কর্যাছ ভাল আর কিছু আছে।”
এত কিছু খাওয়ার পরও ভোজনরসিক কালকেতু তার স্ত্রীকে রান্নার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে আর কিছু আছে কিনা জানতে চাওয়ার মধ্যে কবি কঙ্কণের মুনশিয়ানা ধরা পড়ে যায়। ধন্যবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোমলা, স্নেহময়ী নারী ফুল্লরা সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দেয়—
“এন্যাছি হরিণী দিয়া দধি এক হাঁড়ি৷৷
তাহা দিয়া অন্ন বীর খায় তিন হাঁড়ি৷”
উৎপ্রেক্ষা অলংকারের সাহায্যে বীর কালকেতুর ভোজন প্রকৃতিতেও তুলির আঁচড়ে জীবন্ত রূপে তুলে ধরেছেন—
"শয়ন কুৎসিত বীরের ভোজন বিটকাল৷
ছোট গ্রাস তোলে যেন তেয়াটিয়া তাল।”
কালকেতুর ভোজন শেষ হলে পর আচমন করে হরিতকী খেয়ে মুখশুদ্ধি করল এবং বীর কালকেতু শয়ন করতে গেল। কবি মুকুন্দ কৌতুকের সঙ্গে কালকেতুর ভোজনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছেন। কবি মুকুন্দ যেন বোঝাতে চেয়েছেন কালকেতু যেমন মহাবীর, প্রতিদিন সে যেমন বিরাট বিরাট পশু মৃগয়া করে আনে, তেমনি সে ভোজনও করে প্রচুর।
কবি কঙ্কণের কালকেতুর ভোজন বর্ণনার মধ্যে কৌতুকরসের পরিবেশন করেছেন। আসলে কৌতুক বা হাসির কারণ হল অসঙ্গতি। প্রকৃত হাস্যরসিক আসলে জীবনরসরসিক কবি মুকুন্দ জানতেন সুখ ও দুঃখ জীবনের দুটি দিক। কারণ তিনি বুঝেছিলেন ‘বিশুদ্ধ হাসি জীবনভোজে সৈন্ধব লবণ’। জীবনে দুঃখ পেলেও, রাজশক্তির দ্বারা নির্যাতিত হলেও জীবনের হাসিটুকু তার মুখ থেকে মিলিয়ে যায়নি। সমাজের প্রতি কোন তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ বিদ্রূপ কবি মুকুন্দের ছিল না। নিরাসক্ত চিত্তে স্নিগ্ধ আনন্দের উপকরণ হয়ে উঠেছে—কবি মুকুন্দের কৌতুকপরায়ণতা। কেননা, কবি মুকুন্দের জীবনবোধের মধ্যে ছিল সর্বাত্মক প্রসন্নতা। তাই সমালোচক বলেছেন—“কৌতুকস্রষ্টার মানবচরিত্রবোধ ও গভীর সহানুভূতি থাকা অপরিহার্য। মানুষকে তার সমস্ত ত্রুটি বিচ্যুতি সহ ভালবাসতে না পারলে এ জাতীয় কৌতুক স্রষ্টার দৃষ্টি মানুষের জীবনের সকল বিভাগে ও স্তরে প্রসারিত হওয়া সম্ভব নয়।”
যে গভীর জীবনবোধ থেকে হাস্যরসের জন্ম, মধ্যযুগের কবিদের সেই জীবনবোধের অভাব ছিল, তবে কবি মুকুন্দ তার ব্যতিক্রম। ধর্মীয় সংস্কারের দ্বারা তাঁদের দৃষ্টিশক্তি আচ্ছন্ন ছিল বলে তাঁরা জীবনের গভীরতম প্রদেশে দৃষ্টি নিক্ষেপের প্রয়োজন বোধ করেননি। তাই তাদের রচনায় পুচ্ছগ্রাহিতার লক্ষণ বিদ্যমান। বস্তুত: হাস্যরসিকের জীবনদৃষ্টি এক উদার ক্ষমাসুন্দর জীবনদৃষ্টি। এই জীবনদৃষ্টি ছিল বলেই কবি মুকুন্দ কালকেতুর ভোজনের বর্ণনায় কৌতুকরস পরিবেশন করতে সক্ষম হয়েছেন। কালকেতুর গ্রাস যদি তেয়াটিয়া তাল হয় তাহলে হাসি জাগ্রত তো হবেই। কারণ এর মধ্যে রয়েছে অসংগতি। কিন্তু বর্ণনার গুণে তা কখনো অবাস্তব বা অলৌকিক বলে মনে হয়নি। বরং মহাবীর কালকেতুর ভোজন মহাবীরের মতোই। তাই এই ভোজন দৃশ্যে কবি সরস ও উপভোগ্য চিত্র উপহার দিয়েছেন। এই ভোজন, ভোজনের প্রকৃতি, সেই সঙ্গে ফুল্লরার পরিবেশন, তার শ্রদ্ধা, সম্ভ্রম, কালকেতুর রসিকমন (যেমন, ভোজন শেষে বনিতাকে প্রশ্ন করা ভালো তো রান্না হয়েছে, এরপরে আর কিছু আছে কিনা)—এ সবই শিল্পীর তুলিতে আঁকা অনুপম চিত্র। ভোজনের প্রকৃতি সরস হলেও কালকেতু ও ফুল্লরার দাম্পত্য জীবনের মাধুর্যকে কবি এই সূত্রে উপহার দিয়েছেন।
আরও পড়ুন : ‘কবিকঙ্কনচণ্ডী’ কাব্যের ভাঁড়ু দত্ত চরিত্র
